পঁচিশে বৈশাখ। এটি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় ছাপার আখরে লেখা একটি সাধারণ তারিখ নয়, বরং বাঙালির আত্মিক জাগরণের এক মহালগ্ন। প্রতি বছর যখন এই দিনটি ফিরে আসে, আমরা খুব যত্ন করে একটি আনুষ্ঠানিকতার চাদরে তাকে মুড়িয়ে রাখি। শহরের মোড়ে মোড়ে মাইকের স্বরে রবীন্দ্রসংগীতের মূর্ছনা জাগে, মঞ্চের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে নিপুণ আবৃত্তি, আর সামাজিক মাধ্যমের দেওয়ালে দেওয়ালে ভেসে ওঠে চিরচেনা সব পংক্তিমালা।
এই আয়োজন, এই উৎসব, সবই হয়তো ঠিক থাকে, কিন্তু একটি নিভৃত সত্য প্রায়শই আমাদের অলক্ষ্যে অনুপস্থিত থেকে যায়; সেটি হলো ‘শোনা’। অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনুভবের আঙিনায় স্পর্শ করতে হলে কেবল পড়ার অক্ষরে নয়, এই শোনার নিস্তব্ধতায় ডুব দেওয়াটাই বেশি জরুরি। আর সেই শোনা মানে শুধু সুরের লহরী নয়, বরং গানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিজের ভেতরের অব্যক্ত কথাগুলোকে হৃদয়ঙ্গম করা।
আমাদের চারপাশের একটি দৃশ্য বড়ই পরিচিত, কোথাও হয়তো উদাত্ত কণ্ঠে বেজে উঠছে, ‘এসো হে বৈশাখ’, অথচ তার পাশেই কেউ গভীর মগ্নতায় ফোনের পর্দায় আঙুল বুলিয়ে চলেছেন। কানে শব্দ পৌঁছাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে মনোযোগের বিন্দুমাত্র ছোঁয়া নেই। আমরা শুনছি, কিন্তু হৃদয়ে গ্রহণ করছি না। সুর আর কথাগুলো যেন জীবনের এক যান্ত্রিক পটভূমির শব্দ মাত্র। আশ্চর্যের বিষয় হলো, রবীন্দ্রনাথকে আমরা যত বড় করে দেখি, তত বেশি তাকে আমাদের প্রাত্যহিক যাপন থেকে দূরে সরিয়ে রাখি। আমরা তাকে এমন এক আকাশছোঁয়া উচ্চতায় বসিয়ে দিয়েছি, যেখানে পৌঁছানো সাধারণ মানুষের সাধ্যাতীত।
এতে করে আমাদের হয়তো সুবিধাই হয়; কারণ তাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখলে তাঁর দর্শন বা কথাগুলো আর আমাদের জীবনের দায় হয়ে ওঠে না। কিন্তু প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে যায়, তিনি কি সত্যিই এতটাই দূরের ছিলেন, নাকি আমরা তাকে দূরত্বের আবরণে বন্দি রেখে হাফ ছেড়ে বাঁচতে চাইছি?
একবার কল্পনা করা যাক, কবিগুরু আজ এই মুহূর্তের এই তীব্র ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর অবিরাম উদ্বেগের ভিড়ে আমাদের পাশে এসে বসেছেন। তিনি হয়তো কোনো জটিল তত্ত্বের অবতারণা করতেন না। বরং খুব শান্ত ভঙ্গিতে একটি সাধারণ অনুরোধ করতেন, ‘একটু থামো’। আমাদের বড় সমস্যা হলো, আমরা থামতে জানি না।
আমরা সুর শুনি, কিন্তু সুরের পিঠে সওয়ার হয়ে আসা নীরবতাকে এড়িয়ে যাই। কবিতা পাঠ করি ঠিকই, কিন্তু তার দর্শনকে নিজের জীবনের আয়নায় মিলিয়ে দেখি না। ঘটা করে অনুষ্ঠান সাজাই, কিন্তু প্রকৃত অনুভবকে দরজার বাইরেই দাঁড় করিয়ে রাখি। অথচ তাঁর সারাজীবনের সাধনার এক বিরাট অংশই ছিল মানুষকে নিজের কেন্দ্রাভিমুখে ফিরিয়ে দেওয়া; এমন একটি দরজার ইঙ্গিত দেওয়া, যা বাইরের কোলাহলের দিকে নয়, বরং চিরন্তন শান্তির অভিমুখে ভেতরের দিকে খোলে।
এই বর্তমানের তপ্ত বালুচরে রবি-প্রাসঙ্গিকতা আজও অদ্ভুতভাবে অম্লান। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন স্বাধীনতা মানে কেবল রাষ্ট্রের কাঠামো পরিবর্তন নয়, স্বাধীনতা মানে মনের শৃঙ্খলমুক্তি। ভালোবাসাকে তিনি নিছক জৈবিক সম্পর্কের গণ্ডি থেকে মুক্তি দিয়ে একটি বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে তুলে ধরেছেন। আর জীবনকে দেখিয়েছেন কেবল টিকে থাকার গাণিতিক হিসাব হিসেবে নয়, বরং গভীর অনুভবের এক অসীম সম্ভাবনা হিসেবে। আজ যখন আমরা তথ্যের সাগরে নিমজ্জিত হয়েও অর্থের সন্ধান পেতে হিমশিম খাচ্ছি, যখন চারদিকে শত সংযোগের ভিড়েও একাকিত্ব আমাদের গ্রাস করছে, তখন তাঁর লেখা পড়লে মনে হয় তিনি যেন অতি ধীর পদক্ষেপে খুব স্বাভাবিকভাবে আমাদের ভেতরের অন্ধকারের দিকেই ইঙ্গিত করছেন।
এ কথা হয়তো নতুন নয়, কিন্তু আমরা নতুন করে শুনতে জানি না বলেই প্রতিবার এটি আমাদের কাছে আশ্চর্য নতুন ঠেকে।
তাই পঁচিশে বৈশাখের উদযাপনটি হয়তো খুব জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও চলে। একটি গান শোনা, কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত তস্ময় হয়ে শোনা। একটি কবিতা পড়া, কিন্তু সেটি নিজের জীবনের ক্ষতের পাশে বসিয়ে দেখা। অথবা নিছক কয়েক মিনিটের পূর্ণ নীরবতা। কারণ, পৃথিবীর সব কোলাহল যখন শেষ হয়, ঠিক সেখান থেকেই আসলে আত্মার শ্রবণ শুরু হয়।
রবীন্দ্রনাথকে আমরা যতবার নতুন করে পড়ার চেষ্টা করি, ততবার মনে হয় এ চিরন্তন সত্য তো আগেই কোথাও ছিল, কিন্তু কেন খেয়াল করিনি এতদিন! তিনি কোনো নতুন সত্য উৎপাদন করেন না, বরং আমাদের ব্যস্ততার অজুহাতে সরিয়ে রাখা পুরনো সত্যগুলোকেই আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন।
পঁচিশে বৈশাখ তাই কেবল একটি দিন নয়; দিনটি কেমন কাটবে তা নিয়ে বড় কোনো প্রশ্ন নেই, বরং কিছুটা সময় নিজের গহীন অরণ্যে পৌঁছে তাঁর আলোর দেখা পাওয়া যায় কি না, সেখানেই লুকিয়ে আছে আসল সার্থকতা।
লেখক: কবি, কথা-সাহিত্যিক