রাত গভীর হলে নাট্যমঞ্চের এক ধরনের আলাদা গন্ধ তৈরি হয়। কাঠ, ধুলো, ঘাম, আলো আর দীর্ঘ মহড়ার ক্লান্তি মিশে এই গন্ধ জন্ম নেয়। এটাই থিয়েটারের প্রকৃত গন্ধ। আতাউর রহমান সেই গন্ধজাত মানুষ ছিলেন। মঞ্চের আলো নিভে যাওয়ার পরও যিনি অডিটোরিয়ামের শেষ সারিতে বসে থাকতে পারতেন আলো হয়ে, শুন্য মঞ্চের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। যেন নাটক শেষ হলেও তাঁর ভেতরে আরেকটি নাটক চলতে থাকত।
১২ মে ২০২৬। ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের “মঞ্চসারথি” আতাউর রহমান। তার মৃত্যু শুধু একজন অভিনেতা বা নির্দেশকের বিদায় নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সাংস্কৃতিক জাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠের অবসান।
বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে কিছু নাম উচ্চারণ করলেই একটি সময়, একটি আন্দোলন, একটি সাংস্কৃতিক বিশ্বাস চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আতাউর রহমান ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁদের পরিচয় কোনো একক শিল্পমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন একাধারে অভিনেতা, নির্দেশক, সংগঠক, শিক্ষক এবং সবচেয়ে বড় কথা থিয়েটারকে জীবন হিসেবে গ্রহণ করা এক নিবেদিত মানুষ।
১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীতে জন্ম নেওয়া আতাউর রহমান বেড়ে উঠেছেন এমন এক সময়ে, যখন পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ক্রমশ রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে জড়িয়ে উঠছিল। ভাষা আন্দোলনের অভিঘাত, পাকিস্তান আমলের সাংস্কৃতিক সংকট এবং পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধ তার শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রের সামনে যখন সংস্কৃতিকে পুনর্গঠনের প্রশ্ন দাঁড়ায়, তখন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন মঞ্চ কেবল বিনোদনের জায়গা নয়; এটি মানুষের চিন্তা বদলে দেওয়ারও শক্তি রাখে।
এই বিশ্বাস থেকেই নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি যুক্ত হন বাংলাদেশের আধুনিক মঞ্চআন্দোলনের সঙ্গে। তার কাছে নাটক ছিল সমাজের আত্মসমালোচনার ভাষা। মহড়াকক্ষে তিনি প্রায়ই বলতেন, “সংলাপ মুখস্থ করলেই অভিনেতা হওয়া যায় না; চরিত্রের নীরবতাও বুঝতে হয়।”
১৯৭২ সালে নির্দেশক হিসেবে তার প্রথম নাটক ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ মঞ্চস্থ হয়। সদ্য স্বাধীন দেশের ভাঙাচোরা বাস্তবতায় থিয়েটার করা ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। অর্থের সংকট ছিল, অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা ছিল, দর্শকের অভ্যাসও তখনো গড়ে ওঠেনি। কিন্তু আতাউর রহমানদের প্রজন্ম বিশ্বাস করত একটি জাতির আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখতে সংস্কৃতির প্রয়োজন আছে।
পরবর্তী সময়ে তার নির্দেশনায় গ্যালিলিও, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, রক্তকরবী, বাংলার মাটি বাংলার জল এবং ওয়েটিং ফর গডো–এর মতো নাটক বাংলাদেশের দর্শকদের সামনে নতুন ধরনের নাট্যভাষা হাজির করে। তিনি সহজ জনপ্রিয়তার চেয়ে বৌদ্ধিক গভীরতাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তার নাটকে দর্শক শুধু গল্প দেখত না; ইতিহাস, ক্ষমতা, ভয়, মানবিক সংকট এবং ব্যক্তির স্বাধীনতা নিয়েও ভাবতে বাধ্য হতো বিশেষ করে গ্যালিলিও মঞ্চায়নের সময় তার নির্দেশনা নিয়ে নাট্যাঙ্গনে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। জ্ঞানের স্বাধীনতা বনাম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সংঘাতকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও অদ্ভুতভাবে মিলে যেত। আবার ওয়েটিং ফর গডো–এর মতো জটিল নাটকও তিনি এমন সংযমে নির্মাণ করেছিলেন যে দর্শক সেটিকে নিছক পাশ্চাত্য নাটক হিসেবে নয়, নিজের অস্তিত্বের অভিজ্ঞতা হিসেবেও অনুভব করেছিল।
তার নির্দেশনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল শৃঙ্খলা। সহশিল্পীরা প্রায়ই বলতেন, মহড়ায় তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। সংলাপের ভঙ্গি, মঞ্চে হাঁটার গতি, এমনকি নীরব থাকার সময়টুকুও তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন। কোনো অভিনেতা অতিরিক্ত আবেগ দেখালে তিনি থামিয়ে দিতেন। বলতেন, “চিৎকার করলেই অনুভূতি তৈরি হয় না।”
তবে এই কঠোরতার ভেতরে ছিল শিল্পের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। নতুন অভিনেতারা সমীহের ভয়ও পেতেন তাকে, আবার নির্ভরও করতেন তার ওপর। মহড়া শেষে অনেক রাত পর্যন্ত তিনি তরুণ নাট্যকর্মীদের সঙ্গে বসে নাটক, সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ কিংবা শেক্সপিয়ার নিয়ে কথা বলতেন। তার কাছে থিয়েটার ছিল শুধু মঞ্চের কাজ নয়; এটি ছিল চিন্তার চর্চা।
রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। একইসঙ্গে শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজেডির ব্যাপ্তিও তাকে টানত। কিন্তু তিনি কখনও কেবল অনুকরণে বিশ্বাস করেননি। তার নাট্যচিন্তার শিকড় ছিল বাংলার মাটি ও মানুষের অভিজ্ঞতায়। তাই তার মঞ্চে পাশ্চাত্যের নাটকও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মিশে যেত।
অভিনেতা হিসেবেও তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র। তার কণ্ঠের ভর, সংলাপ বলার ধীর অথচ তীক্ষ্ণ ভঙ্গি এবং নীরবতাকে ব্যবহার করার ক্ষমতা দর্শকদের মুগ্ধ করত। একটি প্রদর্শনীতে তার সংলাপ শুরু হওয়ার আগে দীর্ঘ বিরতিতে পুরো মিলনায়তন এতটাই নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল যে দর্শকের কাশির শব্দ পর্যন্ত আলাদা করে শোনা যাচ্ছিল। এই নীরবতার নিয়ন্ত্রণ খুব কম অভিনেতারই থাকে।
শুধু মঞ্চে নয়, টেলিভিশন অভিনয়েও তিনি রেখে গেছেন শক্তিশালী উপস্থিতি। তবে জনপ্রিয়তা বাড়ার পরও তিনি মঞ্চ ছাড়েননি। কারণ তার বিশ্বাস ছিল, ক্যামেরার অভিনয় মানুষকে বিনোদন দিতে পারে, কিন্তু থিয়েটার মানুষকে সরাসরি নাড়িয়ে দেয়।
২০০১ সালে তিনি একুশে পদক এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার অর্জন করেন। কিন্তু তার প্রকৃত স্বীকৃতি ছিল দর্শকের ভালোবাসা এবং নাট্যকর্মীদের শ্রদ্ধা। কারণ তিনি শুধু নাটক নির্মাণ করেননি; তিনি একটি নাট্যসংস্কৃতি নির্মাণে ভূমিকা রেখেছেন।
আজ দেশের বিভিন্ন অডিটোরিয়ামে আলো জ্বলবে, পর্দা উঠবে, নতুন অভিনেতারা সংলাপ বলবে। কিন্তু কোথাও না কোথাও একটি শূন্যতা অনুভূত হবে। কারণ মঞ্চের এক নিবেদিত প্রাণ আর নেপথ্য থেকে নির্দেশ দেবেন না।
তবু সত্যিকারের নাট্যমানুষেরা পুরোপুরি চলে যান না। তারা থেকে যান কাঠের মঞ্চের গন্ধে, মহড়ার ক্লান্ত সন্ধ্যায়, ধুলোমাখা স্ক্রিপ্টের পাতায় এবং নতুন অভিনেতার কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারিত প্রথম সংলাপে।
আতাউর রহমানও সেভাবেই থেকে যাবেন বাংলাদেশের নাট্যইতিহাসে এক দীপ্ত, গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি হয়ে।