ভোর সাড়ে ৬টা। চারদিকে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে যখন নতুন দিনের শুরু, ঠিক তখনই একটি ফোনকল স্তব্ধ করে দিল একটি পরিবারকে। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো—‘আমি পাঁচজনকেই শেষ করে দিয়েছি, এখন পালিয়ে যাচ্ছি’। পেশায় চালক ফুরকান মিয়ার এই একটি ফোনকলই এখন গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউতকোনা গ্রামের সবচেয়ে বড় বিভীষিকা।
শনিবার সকালে প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলায় যখন প্রতিবেশীরা প্রবেশ করেন, তাদের সামনে পড়ে যায় এক বীভৎস দৃশ্য। ঘরের মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে আছে তিন নিষ্পাপ শিশু—১৫ বছরের মীম, ৮ বছরের মারিয়া আর মাত্র ২ বছরের ছোট্ট ফারিয়া। সবারই গলা কাটা। পাশের বিছানায় নিথর পড়ে আছে শ্যালক রসুল মিয়া। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্যটি ছিল জানালার গ্রিলে, যেখানে হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় ঝুলছিল মা শারমিনের নিথর দেহ।
স্বজনরা জানান, শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ফুরকান তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী রাশিদাকে ফোন করে জানান, তিনি পাঁচজনকে হত্যা করে পালিয়ে যাচ্ছেন। এরপর প্রতিবেশীরা ওই বাড়িতে গিয়ে বীভৎস দৃশ্য দেখতে পান।
অনুসন্ধানে পুলিশ ঘরের ভেতর থেকে কিছু আলামত উদ্ধার করেছে, যা এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের গল্প বলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডাইনিং টেবিলে পড়ে ছিল রান্না করা পায়েশ, কোকাকোলার বোতল এবং দেশীয় মদের খালি বোতল। ধারণা করা হচ্ছে, নেশার ঘোরে বা পরিকল্পিতভাবে পরিবারের সবাইকে অচেতন করেই এই পৈশাচিক উল্লাস চালিয়েছেন ফুরকান।
মরদেহের পাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল বেশ কিছু প্রিন্ট করা কাগজ। সেই কাগজের সূত্র ধরে পুলিশ জানতে পেরেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ফুরকান আগে থেকেই তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং পরকীয়ার অভিযোগ এনে থানায় অভিযোগ করেছিলেন। সেই অভিযোগের কপিগুলো মরদেহের পাশে রেখে যাওয়া কোনো ‘প্রতিশোধের’ বার্তা কি না, তাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কালীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, পারিবারিক কলহ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং জেলা প্রশাসনের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে আলামত সংগ্রহ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইতোমধ্যে দুজনকে আটক করা হয়েছে, তবে ফুরকান এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।