বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) দীর্ঘ ১৭ বছর চলমান শিক্ষার্থী নির্যাতন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ছাত্র ও অ্যালামনাইদের ওপর সংঘটিত হত্যাচেষ্টার ঘটনার বিচার নিশ্চিতের দাবিতে আজ রোববার এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুটেক্স ক্যাম্পাসে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বুটেক্স অ্যান্টি টর্চার মুভমেন্ট।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের মুখপাত্র ও বুটেক্স ডিবেট ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাকিব বিন আতিক বলেন, ‘জ্ঞান, নৈতিকতা ও প্রগতিশীলতার প্রতীক হওয়ার কথা যে বিশ্ববিদ্যালয়ের, সেই বুটেক্সে বছরের পর বছর সহিংসতা, নিপীড়ন ও বিচারহীনতার ভয়াবহ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।’ প্রশাসনিক নীরবতা ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণে এই সংস্কৃতি আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বক্তারা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে বুটেক্স ক্যাম্পাসে পরিকল্পিতভাবে ছাত্রদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে একাধিক শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাই গুরুতর আহত হন এবং অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন। হত্যাচেষ্টার মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হলেও আজ পর্যন্ত এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেওয়াকে কখনোই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না এবং হত্যাচেষ্টাকে রাজনৈতিক ঘটনার অজুহাতে ধামাচাপা দেওয়া যায় না। বক্তারা অভিযোগ করেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে গত ১৭ বছরে বুটেক্স ক্যাম্পাসে সংঘটিত নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, এই সময়ে শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, মেরে রক্তাক্ত করা, কানের পর্দা ফাটিয়ে দেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং মিথ্যা মামলায় দীর্ঘদিন কারাবন্দি রাখার মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটেছে। এসব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ইতোমধ্যে প্রকাশিত ‘নির্মমতার আতুরঘর: প্রসঙ্গ বুটেক্স ছাত্রলীগ’ বইয়ে উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়। বইটি নিয়ে শহীদ ওসমান শরীফ হাদি ইতোমধ্যে বিদেশি কূটনীতিকদের ডেকে ব্রিফ করারও পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে।
বক্তারা আরও বলেন, নির্যাতিত শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলো মামলা পরিচালনা ও চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্যাতিতদের জন্য কোনো আইনি বা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দিলেও তা বাস্তবে কার্যকর হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়।
বুটেক্স অ্যান্টি টর্চার মুভমেন্ট মনে করে, বিচারহীনতাই ক্যাম্পাসে সহিংসতার পথ খুলে দেবে। অপরাধীরা শাস্তির মুখোমুখি না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাস ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সংগঠনটি ৭টি দাবি উত্থাপন করেছে—
১. জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ছাত্র ও অ্যালামনাইদের ওপর হত্যাচেষ্টার ঘটনায় জড়িত সব ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করা।
২. গত ১৭ বছরে বুটেক্স ক্যাম্পাসে সংঘটিত সব শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা তদন্তের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করা।
৩. অভিযুক্তদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত আসন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনে অভিযুক্তদের সার্টিফিকেট প্রদান স্থগিত রাখা। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন নির্যাতিতরা।
৪. ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
৫. ভবিষ্যতে যাতে কোনো শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার না হন, সে লক্ষ্যে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
৬. শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় সরাসরি জড়িত হওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক হিসেবে বহাল ব্যক্তিদের অবিলম্বে বহিষ্কার।
৭. নির্যাতিত শিক্ষার্থীদের যথাযথ আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে বক্তারা বলেন, তারা কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি চান না। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ন্যায়বিচার, নিরাপদ ক্যাম্পাস এবং ভয়ের ঊর্ধ্বে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা। সমাবর্তনের আগ পর্যন্ত সময় দিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দৃশ্যমান উদ্যোগের আহ্বান জানান। ‘কোনো খুনির গায়ে সমাবর্তন গাউন চাই না’ বলেও মন্তব্য করেন তারা। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে সতর্ক করেন বক্তারা।