রাজধানীর আলোচিত রেস্টুরেন্ট চেইন সুলতান’স ডাইনকে ঘিরে আবারও শুরু হয়েছে সমালোচনা। এবার অভিযোগ উঠেছে, তাদের পরিবেশিত বোরহানির গ্লাসে পাওয়া গেছে জ্যান্ত পোকা। ঘটনাটি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, চকচকে সাজসজ্জা আর ব্র্যান্ডিংয়ের আড়ালে সুলতান ডাইনের খাবারের মান আসলে কতটা নিরাপদ?
ঘটনার সূত্রপাত গত রোববার দুপুরে। আইনজীবী ওসমান গনি নোমান তার এক বন্ধুকে নিয়ে সুলতান’স ডাইনের একটি শাখায় খাবার খেতে যান। খাবারের সঙ্গে বোরহানি পরিবেশন করা হলে গ্লাসে চুমুক দেওয়ার আগেই তার চোখে পড়ে অস্বাভাবিক কিছু। তিনি দেখেন, বোরহানির ভেতরে ছোট একটি পোকা নড়াচড়া করছে। বিষয়টি দেখে তিনি হতভম্ব হয়ে যান। পরে নিজের মোবাইল ফোনে পুরো ঘটনাটির ভিডিও করেন।
ওসমান গনি নোমান পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তবে কিছু সময় পর ভিডিওটি আর দেখা যায়নি। এতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, ভিডিওটি কেন সরিয়ে নেওয়া হলো? কোনো চাপ ছিল কি না, সেটি নিয়েও অনেকে আলোচনা করছেন। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা যায়নি।
ঘটনার পর রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বললে দায়িত্বরত এক ম্যানেজার এটিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল’ বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানে খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ যদি ঠিকভাবে করা হতো, তাহলে এমন ঘটনা ঘটার সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো?
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সুলতান’স ডাইনের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম অভিযোগ নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে খাবারের মান, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। কয়েক বছর আগে রাজধানীর একাধিক শাখায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে জরিমানাও করেছিল। তখন রান্নাঘরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, খাবার সংরক্ষণে অনিয়ম এবং মেয়াদোত্তীর্ণ উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায় বলে জানিয়েছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগেও কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেছিলেন, খাবারে চুল, পোকা কিংবা দুর্গন্ধ পাওয়া গেছে। যদিও প্রতিবারই প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় এখন অনেকেই বলছেন, বিষয়টি আর ‘বিচ্ছিন্ন’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করা কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, বোরহানির মতো দুগ্ধজাত পানীয় ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে খুব দ্রুত সেখানে জীবাণু, পোকা বা ফাঙ্গাস জন্মাতে পারে। বিশেষ করে রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা, কাঁচামালের মান এবং সংরক্ষণব্যবস্থা ঠিক না থাকলে এমন ঘটনা ঘটার ঝুঁকি বেড়ে যায়। আর এসব খাবার খেয়ে মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়া, পেটের অসুখসহ নানা জটিলতায় পড়তে পারেন।
এ ঘটনায় সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অনেকে বলছেন, জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হওয়ায় মানুষ না দেখেই অনেক সময় খাবারের ওপর ভরসা করেন। কিন্তু দামী রেস্টুরেন্ট মানেই যে নিরাপদ খাবার, এই ধারণা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ক্ষমা চাওয়া বা ‘ভুল হয়েছে’ বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বড় রেস্টুরেন্টগুলোকে নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং গ্রাহকের অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। নইলে মানুষের আস্থা আরও কমবে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, সুলতান’স ডাইনের এই ঘটনা কি সত্যিই একটি দুর্ঘটনা, নাকি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার আরেকটি উদাহরণ? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, খাবারের নামে মানুষ আসলে কী খাচ্ছে? সুলতান ডাইনের মতো বড় প্রতিষ্ঠানেরই যদি এই দশা হয় ছোট খাবার দোকানগুলোর অবস্থা তো তাহলে কল্পনাই করা যায় না!