ঈদের ছুটিতে যখন পুরো দেশ উৎসবের আলোয় ভাসছে, তখন রাজধানী পরিণত হয়েছে এক নীরব ট্র্যাজেডির নগরীতে। গত ২৬ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ঢাকার আলাদা আলাদা এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১০ জনের মরদেহ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে এই মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পারিবারিক কলহ, বেকারত্ব, অনটন আর মানসিক অবসাদের চরম বলি হয়েছেন এই ১০ জন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাতুয়াইল ঠাকুরবাড়ি এলাকার একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় শ্রাবণী আক্তার পলি নামে এক গৃহিণীর মরদেহ। যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আওলাদ হোসেনের সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে ২৭ মে বিকেলে গলায় ফাঁস দেন তিনি।
২৬ মে রাত ৯টার দিকে দারোগাবাড়ি এলাকার একটি বাসার দ্বিতীয় তলা থেকে মামুনুর রশিদ নামে এক চাকরিজীবীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে ভাটারা থানা পুলিশ। এসআই আবু ইউসুফ জানান, পারিবারিক কলহের জেরে তিনি আত্মহননের পথ বেছে নেন।
২৯ মে সন্ধ্যা ৭টার দিকে ভাটারা সোলমাইদ ব্যাপারীবাড়ি এলাকার একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় পূর্ণিমা আক্তার নামে এক গৃহিণীর মরদেহ। এটিকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করা হলেও এসআই ইয়াউর রহমান উল্লেখ করেন, সাংসারিক বিরোধের জেরে স্বামী তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে নিজের শিশু সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে গেছে।
ঈদের আনন্দ যখন ঘরে ঘরে, তখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ঘরে থাবা বসিয়েছে আর্থিক অনটন ও বেকারত্বের হতাশা। পূর্ব রামপুরা অগ্নিশিখা গলির একটি বাসা থেকে ২৮ মে রাতে আব্দুল্লাহ নামে এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেন রামপুরা থানার এসআই সুব্রত পাল। জানা যায়, দীর্ঘদিনের চরম আর্থিক সংকট ও বেকারত্বের গ্লানি সইতে না পেরে তিনি গলায় ফাঁস দেন।
২৯ মে দুপুরে ভাটারা শোলমাইল দর্জিবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মনির গাজী নামের এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেন এসআই জাহিদুল ইসলাম। মনির জনপ্রিয় ফুড ডেলিভারি অ্যাপ ‘ফুডপ্যান্ডা’র রাইডার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পশ্চিম আশ্রাফাবাদ এলাকার একটি বাসা থেকে ২৯ মে রাত ৯টার দিকে এনামুল ওরফে সুমন নামে এক রিকশাচালকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এসআই ব্রজ কিশোর পাল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
উৎসবের ছুটির মধ্যেই রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত শপিং মলে ঘটেছে এক লোমহর্ষক আত্মহত্যার ঘটনা। ২৭ মে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে পান্থপথের বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সের ওপর থেকে নিচে লাফিয়ে পড়েন অজ্ঞাতনামা এক যুবক। মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সামনের ফুটপাত থেকে ২৮ মে সকাল ৭টার দিকে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাতনামা এক ভবঘুরের মরদেহ। এসআই রাসেল পারভেজ মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কিশোরদের আবেগীয় অবক্ষয় এবং পরিবারের অসতর্কতাও এই ছুটির ট্র্যাজেডিতে যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা। ডেমরার ডগাইর পশ্চিমপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে শাকিল হোসেন নামে এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এসআই আহসান হাবিব জানান, একটি প্যাকেজিং কারখানায় কর্মরত শাকিলের সাথে একটি মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এটি নিয়ে পরিবারের সাথে মনোমালিন্য হওয়ায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে এই কিশোর।
ডেমরা মেন্দিপুর আমান মার্কেট এলাকার নিজ বাড়ির পাশে ২৮ মে দুপুর ২টার দিকে আবাদি জমির পানিতে পড়ে যায় অয়ন্তী নামে মাত্র ২ বছরের এক শিশু। পরিবারের সদস্যরা উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মাত্র ৫ দিনের মধ্যে রাজধানীর বুকে ১০টি অস্বাভাবিক মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, উৎসবের আলো ঝলমলে যান্ত্রিক শহর ঢাকার ভেতরে এক তীব্র একাকীত্ব, মানসিক ট্রমা ও অর্থনৈতিক হাহাকার গ্রাস করছে নাগরিকদের। পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা এবং আর্থিক নিরাপত্তার অভাব সাধারণ মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে আত্মহনন কিংবা খুনের মতো চরম অপরাধের দিকে।