ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে পড়ে থাকা ১৫ বছরের কিশোরীর মরদেহ ঘিরে বেরিয়ে এসেছে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ। নিহত মিম আক্তারকে একটি বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজে দেওয়া হয়েছিল। পরিবারের দাবি, মৃত্যুর আগে মিম ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে জানিয়েছিল, তাকে মারধর করা হচ্ছে এবং সেখান থেকে তাকে নিয়ে যেতে। কিন্তু সেই আকুতি শেষ পর্যন্ত পৌঁছায়নি পরিবারের কাছে।
গত ১২ আগস্ট ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে একটি ট্রলিতে কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেন হাসপাতালের কর্মচারীরা। পরে প্রযুক্তির সহায়তায় শাহবাগ থানা পুলিশ নিহতের পরিচয় শনাক্ত করে।
নিহতের নাম মিম আক্তার। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন, এ বি এম আব্দুর রাজ্জাক (৪৭), মো. ফয়সাল আহমেদ (৩৫) ও রাহেমা খাতুন রেশমা (২৯)।
নিহত মিমের বড় বোন রুমা নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘ছোটবেলায় মিম একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত। কিছুটা চঞ্চল স্বভাবের হওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে বাসাবাড়িতে কাজে দেওয়া হয়। প্রায় এক বছর এক মাস ধরে সে ওই বাসায় কাজ করছিল।’
তিনি জানান, মৃত্যুর প্রায় এক মাস আগে মিম ফোন করে কান্নাকাটি করে তাকে বলেছিল, ‘আমাকে নিয়ে যাও, ওরা আমাকে অনেক মারধর করে।’
পরিবারের অভিযোগ, মিমের সঙ্গে তারা ফোনে কথা বলার সময়ও বাসার লোকজন সামনে থাকত। দু-চার মিনিটের বেশি কথা বলার সুযোগ দেওয়া হতো না তাকে।
রুমার ভাষ্য, ‘প্রতি মাসের ১০ তারিখে মিমের বেতন পরিবারের কাছে পাঠানো হতো। চলতি মাসে ৪ তারিখেই বেতন পাঠানো হয়। সেদিন রাতেই পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়, মিমের সঙ্গে তাদের কিছুটা বাকবিতণ্ডা হয়েছিল এবং তাকে একটি থাপ্পড় দেওয়া হয়েছিল।’
এরপর পরিবারকে বলা হয়, মিম নাকি কারও সঙ্গে পালিয়ে গেছে। এমনকি তার সঙ্গে ২৫ হাজার টাকা ছিল বলেও জানানো হয়।
রুমা জানান, ঢাকা শহর ভালোভাবে না চেনায় তারা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও মিমের সন্ধান পাননি তারা। পরে ২০ আগস্ট রাতে শাহবাগ থানা থেকে ফোন করে তাদের জানানো হয়, মিমকে পাওয়া গেছে। এরপর থানায় গিয়ে মিমের মরদেহের ছবি দেখে ভেঙে পড়ে তার পরিবার।
রুমার দাবি, মিমের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ও কামড়ের দাগ ছিল। পরিবারের দাবি, একাধিক ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করেছে। তবে এসব অভিযোগের এখন পর্যন্ত কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
পরিবার আরও দাবি করে, ১২ আগস্ট মিমকে হত্যা করা হয়। পরদিন তাদের জানানো হয় যে, সে বাসা থেকে পালিয়ে গেছে।
শাহবাগ থানা সূত্রে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ প্রযুক্তির সহায়তায় নিহতের পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু করে।
এ ঘটনায় ১৩ আগস্ট শাহবাগ থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়। পরে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ভোর আনুমানিক ৫টা ১০ মিনিটে রাজধানীর ডেমরা থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, অপরাধ আড়াল করার উদ্দেশ্যে মিমের মরদেহ ঢামেক হাসপাতালের সামনে ফেলে রেখে চলে যায় অভিযুক্তরা। পরে গ্রেপ্তার এড়াতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় এলাকার বাসা ছেড়ে তারা স্বপরিবারে অন্যত্র আত্মগোপনে চলে যায়। এ ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।