সিরাজগঞ্জে দিন দিন বাড়ছে সূর্যমুখী চাষের পরিধি। কম খরচে বেশি লাভ এবং ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে সম্ভাবনাময় এই ফসল কৃষকদের স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কৃষকেরা ঝুঁকছেন সূর্যমুখী আবাদে। ফলে বদলে যাচ্ছে জেলার কৃষির চিত্র।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার ৯টি উপজেলায় ২৮০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ইতোমধ্যে প্রায় ২৭০ হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। হেক্টর প্রতি গড়ে ১ দশমিক ৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। বীজ বপনের তিন মাসের মধ্যেই ফসল সংগ্রহ করা সম্ভব। প্রতি গাছে একটি করে ফুল আসে, যা পরবর্তীতে বীজে রূপান্তরিত হয়।
বিশেষ করে নদীভাঙন ও বালুময় চরাঞ্চলে সূর্যমুখী ভালো ফলন দিচ্ছে। ধান কাটার পর পতিত জমি কাজে লাগিয়ে অনেক কৃষক এ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। সদর, কাজীপুর, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে। মাঠজুড়ে এখন হলুদ সূর্যমুখীর সমারোহ— যা যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি কৃষকের মুখে ফুটিয়েছে হাসি।
সদর উপজেলার কাওয়াকোলা ইউনিয়নের বর্ণী চরের কৃষক ইউসুফ আলী জানান, যমুনার চরাঞ্চলের অধিকাংশ জমি পতিত পড়ে থাকে। তিনি ৪ বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকা খরচ করে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লাভের আশা করছেন।
বহুলী ইউনিয়নের ধীতপুর আলাল গ্রামের কৃষক আলী আকবর বলেন, গত দুই বছর ধরে সূর্যমুখী চাষ করছেন। এবারও ১ বিঘা জমিতে চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে গত বছরের চেয়ে বেশি লাভের আশা করছেন তিনি।
কাজীপুর উপজেলার ভানুডাঙ্গা গ্রামের আনোয়ার হোসেন জানান, ধান ও গমের তুলনায় সূর্যমুখী চাষে বেশি লাভ হয়। গত পাঁচ বছর ধরে তিনি এ চাষ করে আসছেন এবং ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখবেন।
চৌহালী উপজেলার ওমরপুর চরের কৃষক আলতাফ হোসেন বলেন, প্রতি বিঘা জমিতে ৮ থেকে ৯ মণ পর্যন্ত বীজ পাওয়া যায়। প্রতি কেজি বীজ থেকে প্রায় আধা লিটার তেল উৎপাদন সম্ভব। সে হিসাবে প্রতি বিঘায় ১৪০ থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত তেল মিলতে পারে। বর্তমানে প্রতি লিটার সূর্যমুখী তেলের বাজারমূল্য কমপক্ষে ২৫০ টাকা। এছাড়া বীজের খৈল পশুখাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
সূর্যমুখী ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমীরা ভিড় করছেন মাঠে। স্বপ্না পারভীন ও ভাবলী খাতুন নামে দুই দর্শনার্থী জানান, হলুদ ফুলে ছেয়ে থাকা মাঠ আর নীল আকাশের মিলনে তৈরি হওয়া মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তাদের মুগ্ধ করেছে। এমন প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটানো প্রশান্তির এবং সূর্যমুখীর সারির সঙ্গে ছবি তোলা এক ভিন্ন রকমের আনন্দ দেয় বলে তারা জানান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ. কে. এম. মনজুরে মাওলা জানান, জেলার মাটি সূর্যমুখী চাষের জন্য উপযোগী। সূর্যমুখীর বীজ থেকে তেল উৎপাদনের পাশাপাশি হাঁস-মুরগির খাবার প্রস্তুত করা যায়। এতে থাকা লিনোলিক এসিড হৃদপিণ্ডের জন্য উপকারী। কৃষি বিভাগ উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিয়ে সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণে কাজ করে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে,সূর্যমুখীর সোনালি আভায় বদলে যাচ্ছে সিরাজগঞ্জ-এর কৃষি অর্থনীতি। কম খরচ, কম ঝুঁকি আর ভালো লাভ— এই সমীকরণেই কৃষকেরা দেখছেন স্বাবলম্বিতার নতুন স্বপ্ন।