কক্সবাজার শহরের বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় ধানক্ষেতের মাঝখানে তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি ছোট্ট মসজিদ ঐতিহাসিক ‘সাচী চৌধুরী জামে মসজিদ’ দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয়দের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। অনেকে একে ‘গায়েবি মসজিদ’ কিংবা ‘পোটকা মসজিদ’ নামেও চেনেন। তবে মসজিদটি ঠিক কবে নির্মিত হয়েছে বা কে নির্মাণ করেছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মসজিদটি কক্সবাজার বাস টার্মিনালের উত্তর দিকে পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বিজিবি ক্যাম্প এলাকার পূর্ব পাশে অবস্থিত। উত্তরে একটি বিশাল দিঘি, দক্ষিণ-পূর্ব পাশে কবরস্থান এবং চারপাশে খোলা প্রান্তর— সব মিলিয়ে স্থানটি শান্ত ও নৈসর্গিক পরিবেশে ঘেরা।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে, এটি কক্সবাজারের প্রথম মসজিদ। চট্টগ্রাম বিভাগের তথ্যসূত্রে জানা যায়, ১৬০০ থেকে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মুঘল সুবাদার শাহ সুজার আমলে এ অঞ্চলে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল।
অনেকের ধারণা, সেটিই বর্তমান সাচী চৌধুরী জামে মসজিদ। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো দলিল নেই।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মসজিদটি কে নির্মাণ করেছেন বা কত বছর আগে নির্মিত হয়েছে, তার সঠিক ইতিহাস কারও জানা নেই। তবে স্থানীয়দের ধারণা, এর বয়স অন্তত চার শতাধিক বছর।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মসজিদটির ভেতরের আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ২৩ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৪ ফুট। বাইরে থেকে মাপ ৩৪ ফুট বাই ২৬ ফুট। পূর্ব পাশে পাঁচ থেকে ছয় ফুট প্রশস্ত একটি বারান্দা রয়েছে। একসঙ্গে প্রায় ৫০ জন মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন।
মসজিদের দেওয়াল প্রায় পাঁচ ফুট পুরু এবং চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত। কোথাও লোহার ব্যবহার নেই। ছাদের ওপর পাশাপাশি তিনটি গম্বুজ রয়েছে, যা মুঘল আমলের স্থাপত্যরীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। একটি মাত্র দরজা ও দুটি জানালাবিশিষ্ট এ মসজিদের দরজার উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট। বর্তমানে মসজিদের ফ্লোর টাইলস দিয়ে আবৃত। ধারণা করা হয়, মূল মেঝে বর্তমান অবস্থান থেকে পাঁচ থেকে ছয় ফুট নিচে থাকতে পারে।
মসজিদটি ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা। স্থানীয়দের বিশ্বাস, গভীর রাতে এখানে জ্বীনেরা নামাজ আদায় করে। অতীতে অনেক মুসল্লি এ বিশ্বাসের কারণে রাত গভীর পর্যন্ত অবস্থান করতেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা হাফেজ আনোয়ার হোসেন বলেন, আগে অনেকেই মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে পড়ে চলে যেতেন। দিনের বেলাতেও একা নামাজ পড়তে ভয় পেতেন কেউ কেউ। যদিও এসব বিশ্বাসের প্রামাণ্য ভিত্তি নেই, তবুও মসজিদটি ঘিরে আধ্যাত্মিক আবহ এখনো অটুট রয়েছে।
মূল মসজিদের পূর্ব পাশের পুরোনো বারান্দা সম্প্রসারণ করে বর্তমানে দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে নামাজ আদায়ের স্থান বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তরে ফ্লোর করা খোলা জায়গা ও দক্ষিণ-পূর্ব পাশে কবরস্থান রয়েছে।
শুধু মুসলিম নয়, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মানুষও এখানে আসেন। কেউ ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে, কেউ মানত করতে, আবার কেউ আধ্যাত্মিক প্রশান্তির খোঁজে এখানে ভিড় করেন। বিদেশি পর্যটকদের কাছেও এটি আগ্রহের একটি স্থান।
স্থানীয়রা মনে করছেন, যথাযথ গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে মসজিদটির প্রকৃত ইতিহাস উদঘাটন করা জরুরি। পাশাপাশি প্রাচীন এই স্থাপনার সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি। ঐতিহ্য, রহস্য ও ধর্মীয় আবহ— সব মিলিয়ে সাচী চৌধুরী জামে মসজিদ কক্সবাজারের ইতিহাসে এক অনন্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।