(এই প্রতিবেদনের কিছু বর্ণনা পাঠকের অস্বস্তির কারণ হতে পারে)
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকায় শ্বাসনালী কেটে হত্যাচেষ্টার শিকার মেয়ে শিশুটি শেষ পর্যন্ত মারা গেছে। শিশুটির চাচা মো. আব্দুল আজিজ জানান, রাত সাড়ে ৩টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিশুটি মারা যায়।
পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় ইতোমধ্যেই মামলা হয়েছে ও তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। পুলিশ ও শিশুটির পরিবারের সদস্যরা জানান, বাড়ি থেকে প্রায় ৮-১০ কিলোমিটার দূরের দুর্গম পাহাড়ে কারা তাকে নিয়ে গেল সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম জানান, রোববার (১ মার্চ) শিশুটির মা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে যে মামলা করেছিলেন সেটি এখন হত্যা মামলায় পরিণত হবে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) শিশুটির রক্তাক্ত একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে এটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে ও শিশুটির সবশেষ অবস্থা নিয়ে মানুষ আগ্রহী হয়ে ওঠে।
কাটা শ্বাসনালী নিয়ে হেঁটে এসেছিল শিশুটি
পুলিশ, শিশুটির চাচা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাসা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে, যেখানে শিশুটিকে গুরুতর আহত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, সেটি ভূমি থেকে প্রায় এক হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ি এলাকা।
সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক থেকে চন্দ্রনাথ মন্দিরে ওঠার রাস্তার একটি অংশে সংস্কারের কাজ করছিল শ্রমিকরা। রোববার শিশুটি যখন দুর্গম পাহাড় থেকে ওই রাস্তা ধরে হেঁটে নেমে আসছিল তখনো তার গলা থেকে রক্ত ঝরছিল বলে শ্রমিকরা স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান।
শিশুটি প্রথমে রাস্তার কাজে থাকা এক্সকাভেটরের কাছে এসে কিছু বলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু শ্বাসনালী কাটা থাকায় গলা থেকে কোনো শব্দ আসছিল না। দ্রুত সেখানে থাকা শ্রমিকরা কাপড় দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে সেখানে কাজ করার বালুর গাড়িতে করে তাকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
রোববারই শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই রাতেই তার গলায় অস্ত্রোপচারের পর সোমবার সকালে তাকে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেলে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে তার মৃত্যু হয়।
শিশুটির চাচা আব্দুল আজিজ জানান, তাদের পরিবার বসবাস করে সীতাকুণ্ডের ছোট কুমিরার মাস্টারপাড়ায়। আর যেখানে তার ভাতিজিকে পাওয়া গেছে সেটি হলো ইকোপার্কের অনেক ভেতরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। সেখানে বাচ্চাটাকে কে নিয়ে গেল এটাই এখন বড় বিষয়। ‘আমরা চাই এটা খুঁজে বের করা হোক। সে মারা গেছে নির্যাতনের কারণে। দায়ীরা শাস্তি পাক এটাই আমাদের চাওয়া।’
শিশুটির পিতা শ্রমজীবী মানুষ এবং প্রায় আট বছর বয়সী মেয়ে শিশুটি তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় বলে জানান আব্দুল আজিজ। তিনি বলেন, ‘হয়তো নির্যাতন করে গলা কেটে ওকে মেরেই ফেলতে চেয়েছিল। কেমন করে ছোট্ট মানুষটা তখন বাঁচল ও ফেরার চেষ্টা করলো জানি না।’
এদিকে রোববারই শিশুটির মা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামির বিরুদ্ধে অপহরণ করে হত্যাচেষ্টার মামলা করেছিলেন। সেটি এখন হত্যা মামলায় পরিণত হবে বলে জাানায় পুলিশ। সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘কী করে শিশুটি এত দূরে গেল এবং কারা এর সাথে জড়িত এই সব কিছু নিয়ে তদন্ত চলছে। একটু সময় দিন আমাদের। আমরা জড়িত সবাইকেই চিহ্নিত করবো ও আইনের আওতায় আনতে পারব আশা করছি।’
খেলতে যাচ্ছি বলে বের হয়েছিল শিশুটি
শিশুটির বাবারা ছয় ভাই ও এর মধ্যে তিন জন ছোটো কুমিরার মাস্টারপাড়ায় বসবাস করেন। কয়েক মাস আগে শিশুটির বাবা যৌথ পরিবার থেকে আলাদা হয়ে গেলেও শিশুটি প্রায় প্রতিদিনই তার দাদীর কাছে ছুটে যেতো ও বাবা-চাচাদের বাড়িতে ছুটোছুটি করতো বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
চাচার বাসায় থাকা দাদীর কাছে গেলে শিশুটি নিজের বাড়িতেও ফিরতে চাইতো না। অনেক সময় বাবা-মা গিয়ে তাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে হতো বলে বলছেন শিশুটির স্বজনরা।
শিশুটির চাচা আব্দুল আজিজ বলেন, ‘ওইদিনও খুব সকালে মাকে বলেছিল সে খেলতে যাচ্ছে। মা বলছিল তার ভাইকে নিয়ে যেতে। কিন্তু একাই বের হয়ে যায় সে। আমরা ধারণা করি সে হয়তো অন্য দিনের মতো আমাদের বাড়ির দিকেই আসার জন্য বের হয়েছিল। এরপর কীভাবে ওই পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় গেলো, কে তাকে নিয়ে নিয়ে গেল এটিই রহস্য।’
পরিবার ও পুলিশ বলছে, শিশুটিকে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের ভেতরে থাকা সহস্রধারা ঝর্ণা এলাকার আরও প্রায় আধা কিলোমিটার উত্তরে পাহাড়ি পথের ধারে রাস্তার শ্রমিকরা পেয়েছে বেলা সাড়ে দশটার দিকে।
সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর এত অল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে শিশুটিকে ইকোপার্ক থেকে চন্দ্রনাথ মন্দিরের দিকে যাওয়ার অত দূরের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নেওয়া হলো সেটিই এখন স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।