আজ শনিবার ঐতিহাসিক ‘তেলিয়াপাড়া দিবস’। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে ভাস্বর এ দিবসটি সরকারীভাবে পালন করা না হলেও এবার গুরুত্বের সঙ্গে পালনের উদ্দ্যোগ গ্রহন করেছে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড। এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসছেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মীর্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, জাতীয় সংসদের হুইপ হবিগঞ্জ- ৩ আসনের এমপি আলহাজ্ব জি কে গউছ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের চীফ প্রসিকিউটর মো.আমিনুল ইসলাম। এছাড়া থাকবেন স্থানীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ।
আজ সকাল ১০টায় তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সৌধের (বুলেট বেদী) সামনে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সাথে সাথে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। উদ্বোধন করেছেন মীর্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর। সকাল ১১টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠ এবং শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় করা হয়েছে বিশেষ মোনাজাত। পরে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন জেলা ইউনিট কমান্ডের আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা রফিক।
উল্লেখ্য যে, ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাতে হানাদার বাহিনীর গণ হত্যার পর সামরিক বাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর বাঙালী সদস্য ও তরুণ দেশপ্রেমিকরা স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এর মধ্যে ৪ এপ্রিল সামরিক বাহিনীর বাঙ্গালি কর্মকর্তারা হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলা তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোয় এক বৈঠকে মিলিত হন। সেখানেই প্রণীত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের রণকৌশল, যা ‘তেলিয়াপাড়া স্ট্র্যাটেজি’ নামে পরিচিত। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টর উর্ধতন কর্মকর্তাসহ মোট ২৭ জন কর্মকর্তা ওই বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর পাঁচটি বাঙ্গালী রেজিমেন্ট ছিল। এর মধ্যে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চর্তুথ ও অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গণহত্যার আগে থেকেই বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ ও প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেছিল। বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাইরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে প্রশিক্ষণরত সেনাসদস্যসহ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত বাঙ্গালী সেনাদের বড় একটি অংশ পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। অসংগঠিত ও বিচ্ছিন্ন ভাবে শুরু হওয়া এই প্রতিরোধ যুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য তেলিয়াপাড়ায় বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় এম, এ, জি ওসমানী যুদ্ধে নেতৃত্ব দেবেন এবং বাংলাদেশকে চারটি সামরিক অঞ্চলে ভাগ করে সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হবে। এর দায়িত্ব দেওয়া হয় চারজন সিনিয়র কমান্ডারকে। কাজী মুহাম্মদ শফিউল্লাহকে বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহ জেলার পূর্বাঞ্চলের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
মেজর আবু ওসমান চৌধুরীকে দেওয়া হয় কুষ্টিয়া ও যশোর জেলা, ফরিদপুর জেলা এবং দৌলতপুর-সাতক্ষীরা সড়কের উত্তরাংশে যুদ্ধ পরিচালনার বৃহত্তর কুমিল্লা, ঢাকা ও নোয়াখালী অঞ্চলের যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর খালেদ মোশাররফকে। নোয়াখালী, কুমিল্লার আখাউড়া-ভৈরব রেললাইন পর্যন্ত এবং ফরিদপুর ও ঢাকার অংশবিশেষে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর খালেদ মোশাররফকে। অপরদিকে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর জিয়াউর রহমানকে।
ওই বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনকারী বাহিনী সম্পর্কিত সাংগঠনিক ধারণা এবং কমান্ড কাঠামোর রূপরেখা প্রণীত হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় এপ্রিলের ১০ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি, এবং তাজ উদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রী করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার তথা মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। তারপর আরো চারটি সামরিক অঞ্চল ঘোষণা করে সেগুলোর সেক্টর কমান্ডারদের নাম ঘোষণা করা হয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করলেও তেলিয়াপড়ার ৪টা এপ্রিলের সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকের দিনটিকে সরকারিভাবে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সময় মুক্তিযোদ্ধারা নিজ উদ্দোগে দিবসটিকে স্মরনীয় করে রাখতে সভা-সমাবেশ করে আসছেন। দিবসটি সরকারিভাবে পালনের দাবি দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময় সরকারি অনুদানে স্মৃতিসৌধ নির্মানসহ স্থানটির সৌর্ন্দয্যবর্ধনে কিছুটা কাজ করা হয়েছে।
হবিগঞ্জ জেলা ইউনিট কমান্ডের আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা রফিক বলেন, ‘ওই সভায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানে জোরালো ভূমিকা ছিল। বিগত সরকার আমলে এর সঠিক ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। তেলিয়াপাড়ার বৈঠক মুক্তিযুদ্ধের সুতিকাগার। জেনারেল ওসমানী এখান থেকে মুক্তিযদ্ধের
আনুষ্টানিক ঘোষনা দেন। আমরা চাই সঠিক ইতিহাস জাতির সামনে তুলে ধরতে। তাই এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ দিবসটি সরকারিভাবে পালনের জন্য মুক্তিযোদ্ধাসহ বিভিন্ন মহল দাবী জানিয়ে আসছেন। আমরা চাই দিবসটি সরকারিভাবে পালনের জন্য সরকার শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি করবে।’