দেশের একমাত্র পাহাড়ী দ্বীপ মহেশখালী উপজেলার মিষ্টি পানের সুনাম এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাদ, গন্ধ ও প্রাকৃতিক মিষ্টতার জন্য আলাদা পরিচিতি পাওয়া এই পান স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে চাষিরা পড়েছেন নানা সংকটে।
স্থানীয়দের মতে, শতাধিক বছরের ঐতিহ্য বহন করা এই পান চাষ শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, বরং এলাকার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। শীতের মৃদু রোদে পান বরজে ব্যস্ত সময় কাটান চাষিরা। শন ও বাঁশের তৈরি বিশেষ কাঠামো— ‘বরজ’-এর ভেতরে এই পান চাষ করা হয়, যা অন্যান্য ফসলের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে মহেশখালী উপজেলায় প্রায় ১,৬০০ হেক্টর জমিতে পান চাষ করা হয়েছে। এ মৌসুমে উৎপাদিত পানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন। এছাড়া পুরো উপজেলায় মোট ৩৮,১০০টি পান বরজ রয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
গত রোববার উপজেলার হোয়ানক এলাকার কয়েকটি পান বরজ ঘুরে দেখা যায়, চাষিরা পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকলেও তাদের মুখে নেই স্বস্তি।
চাষিদের অভিযোগ, গত দুই মাসে পানের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। আগে প্রতি বিড়া পান ৪০০–৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২০০–২৫০ টাকায়।
স্থানীয় পান ব্যবসায়ী জাবের আহমেদ বলেন, ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল মৌসুমে বড় সাইজের পানের দামে বিড়া প্রতি ১৫০–২০০ টাকা পর্যন্ত কমে গেছে। উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
পান চাষী আলাউল হোসেন জানান, বরজ তৈরির খরচ, সার, কীটনাশক এবং শ্রমিক মজুরি সবই বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে পানের দাম বাড়েনি। ফলে মৌসুম শেষে লাভ তো দূরের কথা, অনেক সময় লোকসান গুনতে হয়।
জানা গেছে, মহেশখালীর উৎপাদিত বড় সাইজের পান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতি বিড়া ৫০০–৬০০ টাকায় বিক্রি হলেও স্থানীয় বাজারে বর্তমানে ২০০–৩০০ টাকার বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে না।
উপজেলার ছোট মহেশখালী, শাপলাপুর, বড় মহেশখালী, হোয়ানক ও কালারমারছড়ার পাহাড়ি ঢাল ও উপকূলীয় সমতলে বছরজুড়ে পান চাষ হয়। পাহাড়ি জমিতে পানগাছ ২–৩ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। সমতলে মৌসুমি চাষের স্থায়িত্ব ৫–৬ মাস। পানচাষি আহমেদ হোসেন বলেন, পাহাড়ি মাটির বিশেষ গুণই মহেশখালীর পানকে দিয়েছে আলাদা মিষ্টতা।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, অন্তত ২০০ বছর ধরে মহেশখালীতে এই পান চাষ হয়ে আসছে। অতীতে রাজা-মহারাজাদের আপ্যায়নে ‘মহেশখালীর খিলি পান’ পরিবেশনের কথাও বিভিন্ন পুরনো দলিলে পাওয়া যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাসান বলেন, ‘এই পান আমাদের সংস্কৃতির অংশ। অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে সামাজিক অনুষ্ঠানে এর ব্যবহার অপরিহার্য।’
চাষিদের দাবি, সঠিক পরিকল্পনা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, আধুনিক বিপণন এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ নিশ্চিত করা গেলে মহেশখালীর পান আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের রপ্তানি পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত প্যাকেজিং ও কোল্ড চেইন ব্যবস্থা চালু করলে সংরক্ষণকাল বাড়বে, ব্র্যান্ডিং (GI ট্যাগ) পেলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বাড়বে এবং সরাসরি রপ্তানি চ্যানেল তৈরি হলে মধ্যস্বত্বভোগী কমবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কক্সবাজার অঞ্চলের উপ-পরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, ‘প্রান্তিক পানচাষিদের সহায়তায় আমরা কাজ করছি। কৃষিঋণসহ বিভিন্ন সহায়তা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’