কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগে আব্দুর রহমান শামীম নামে এক কথিত পীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এসময় দরবার শরিফে হামলা,ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় শামীমের দরবার শরিফে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
নিহত আব্দুর রহমান শামীম (৬৫) ওই দরবার শরিফের প্রধান এবং এলাকায় কালান্দার বাবা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। হামলায় তার তিন অনুসারী-মহন আলী, জামিরুন নেছা ও জুবায়ের আহত হয়েছেন। তাদের দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.তৌহিদুল হাসান তুহিন নাগরিক প্রতিদিন-কে জানান, শামীমের মুখমণ্ডলে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই পীর তার দরবারে অনুসারীদের উদ্দেশ্যে পবিত্র কোরআন শরিফ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। তিনি দাবি করেন, ‘কোরআন যিনি লিখেছেন তিনিও মূর্খ এবং যারা এটি পড়েন তারাও মূর্খ।’ এই বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর জেরে বিক্ষুব্ধ জনতা শামীমের দরবার শরিফে হামলা চালায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত অবস্থায় শামীম ও তার তিন অনুসারীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয়দের দাবি, কোরআন অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ হামলা হয়েছে। ২০২১ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ একাধিক অভিযোগে শামীমের বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা হয়েছিল। ওই সময় তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যও ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেছেন।
দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরিফুর রহমান নাগরিক প্রতিদিন-কে জানান, মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এখনো পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি এবং কাউকে আটক করা হয়নি। এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
এদিকে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গের সমানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কালান্দার বাবা শামীমের মরদেহ মর্গের ভেতরে রাখা হয়েছে। মর্গের সামনে তার আত্মীয়-স্বজনরা দাড়িয়ে আছেন। ময়না তদন্তে শেষে মরদেহ নেওয়ার অপেক্ষায় তারা।
এসময় তার বড় ভাই ফজলুর রহমান জানান, ময়না তদন্ত শেষে দাফনের পর পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখন কথা বলার মতো অবস্থায় নেই।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন নাগরিক প্রতিদিন-কে বলেন, এখানে বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এটি মূলত একটি পুরনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনার ফল। তিনি ২০২৩ সালে একটি বক্তব্য দিয়েছিলেন, যা একটি ভিডিও আকারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই বক্তব্যে ধর্ম নিয়ে এমন কিছু মন্তব্য ছিল, যা অনেকের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে।
তিনি আরও বলেন, সেই সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সম্প্রতি সেই পুরোনো ভিডিওটি আবার নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এর জেরে তার আস্তানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে এবং শামীম জাহাঙ্গীরকে মারধর করা হয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে তার মৃত্যু হয়।
উল্লেখ্য, আব্দুর রহমান শামীম দৌলতপুরে ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে ফিলিপনগর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি, কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বিকম পাস করেন। পরে রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এমকম সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে কেরানীগঞ্জ এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন শামীম। পরে চাকরি ছেড়ে কেরানীগঞ্জের গোলাম-এ-বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হন এবং সেখানে খাদেম হিসেবে বসবাস শুরু করেন। পরে ২০১৮ সালের দিকে পৈতৃক বাড়িতে এসে তিনি নিজে একটি দরবার গড়ে তোলেন।