মেহেরপুর শহরের বিএম মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘটে গেল এক শিউরে ওঠা ঘটনা। স্কুল ছুটির পর বাথরুমে আটকা পড়ে ঘণ্টাব্যাপী মৃত্যুভয়ে কাঁদতে থাকে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী শিশু সাদিয়া (৮)। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের চরম অবহেলায় তালাবদ্ধ স্কুল ভবনের ভেতরে একা পড়ে থাকা এই শিশুর হৃদয়বিদারক আর্তনাদ পথচারীদের কানে না পৌঁছালে হয়তো ঘটতে পারত আরও বড় কোনো বিপর্যয়।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিকেল ৪টার দিকে যথারীতি স্কুল ছুটি ঘোষণা করা হয়। শিক্ষার্থীরা একে একে বাড়ির পথে রওনা দিলেও, অজান্তেই বাথরুমের ভেতরে আটকা পড়ে যায় সাদিয়া। এদিকে শিক্ষকরা পুরো স্কুল ভবন ও মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে চলে যান। নিঃসঙ্গ বিদ্যালয় ভবনে বন্দি হয়ে পড়ে ছোট্ট শিশুটি।
সময় যত গড়াতে থাকে, ততই ভয় তাকে গ্রাস করে। শুরু হয় বুকফাটা কান্না, অসহায় চিৎকার, যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে স্কুলের আশপাশে। অবশেষে সেই আর্তনাদ কানে আসে পথচারীদের। সন্দেহ জাগলে ছুটে আসেন স্থানীয়রা।
এদিকে নির্ধারিত সময় পেরিয়েও মেয়ে বাড়ি না ফেরায় উদ্বেগে অস্থির হয়ে পড়েন সাদিয়ার বাবা, পুরাতন পোস্ট অফিস পাড়ার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম। খোঁজ নিতে গিয়ে তিনিও যুক্ত হন স্থানীয়দের সঙ্গে। পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত উদ্যোগ নেয় এলাকাবাসী। তাদের চেষ্টায় খুলে ফেলা হয় স্কুলের মূল ফটক।
কিন্তু ভেতরে ঢুকে নতুন বাধা বিদ্যালয় ভবনের কলাপসিবল দরজা! সেটি ভেঙে বা খুলে শিশুটির কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছিল না। একদিকে সময় ফুরিয়ে আসছে, অন্যদিকে শিশুটির কান্না আরও করুণ হয়ে উঠছে। চরম উৎকণ্ঠার মুহূর্তে স্থানীয়রা এক শিক্ষিকাকে খবর দেন।
অবশেষে প্রায় এক ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছান শিক্ষিকা লিনা ভট্টাচার্য। তার উপস্থিতিতে খোলা হয় দরজা, আর সেখান থেকেই উদ্ধার করা হয় আতঙ্কে কাঁপতে থাকা সাদিয়াকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিশুটি তখন ভীত-সন্ত্রস্ত।
ঘটনাটি রাত সাড়ে এগারোটার দিকে জানাজানি হলে গণমাধ্যমকর্মীরা বিদ্যালয়ের অফিসিয়াল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু বিষয়টি জানতে চাইলে ফোন কেটে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে একাধিকবার কল করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি, যা আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় রাত প্রায় বারোটার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন মেহেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম। তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেন এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘মেয়েটি সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে, এটাই স্বস্তির। তবে ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে এবং বৃহস্পতিবার শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’