জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে কক্সবাজার জেলায় বোরো ধানের চাষ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় হাজার হাজার সেচপাম্প বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে মাঠে পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে জেলার অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর জমির ধানখেত শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সদরের ভারুয়াখালীর কৃষক রমিজ উদ্দিন তিন একর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে রোপণ করা ধানগাছে নিয়মিত সেচ প্রয়োজন। তিনি একটি ডিজেলচালিত শ্যালো পাম্প বসালেও গত এক মাস ধরে টানা এক ঘণ্টাও পাম্প চালাতে পারছেন না। তিনি জানান , এভাবে আর ২ সপ্তাহ চললে বেশিরভাগ ধানগাছ মারা যাবে।
একই চিত্র দেখা গেছে মহেশখালীর কালারমারছড়া, হোয়ানক , মিজ্জিরপাড়া , সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের মুহুরিপাড়া, বাংলাবাজার ও খরুলিয়া এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে। প্রচণ্ড রোদে জমি ফেটে যাচ্ছে, অথচ সেচের পানির অভাবে কৃষকেরা দিশেহারা।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের ৯টি উপজেলায় মোট ৭ হাজার ১৪৬টি সেচপাম্প রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই ডিজেলচালিত। কিন্তু জ্বালানির সংকটে বর্তমানে ৪ হাজার ২০০টির বেশি পাম্প বন্ধ রয়েছে। ফলে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
চলতি মৌসুমে জেলায় ৫৫ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭৫২ মেট্রিক টন চাল। তবে বর্তমান সংকট অব্যাহত থাকলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়ার কৃষক আমির হামজা বলেন, ‘গত বছর খালের পানি দিয়ে চাষ করেছি। এবার খাল শুকিয়ে গেছে। অন্যের পাম্পের ওপর নির্ভর করছি, কিন্তু ২০ দিন ধরে ঠিকমতো পানি পাচ্ছি না। গাছের রং লাল হয়ে যাচ্ছে।’
হোয়ানক কেরুনতলী এলাকার কৃষক জাহেদুল ইসলাম জানান, সাত কানি জমিতে চাষ করতে তার প্রায় লক্ষাধিক হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু সেচের সংকটে ধান নষ্ট হলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন তিনি।
বিপদগ্রস্ত কৃষকরা জানান, বোরো চাষের প্রায় ৮০ শতাংশই সেচনির্ভর। সময়মতো পানি না পেলে ধানের চারা মাঝপথেই মারা যেতে পারে।
সদরের ঝিলংজার কৃষক মনির আহমেদ বলেন, ‘ফিলিং স্টেশন ঘুরেও ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে খুচরা বাজার থেকে ১৮০ টাকা লিটার দরে কিনতে হচ্ছে।’
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, গভীর নলকূপ চালাতে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৫ লিটার, লো-লিফট পাম্পে চার লিটার এবং শ্যালো পাম্পে দুই লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বোরো উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, কৃষি উৎপাদন রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নাহলে কৃষকের লোকসান যেমন বাড়বে, তেমনি খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার অঞ্চলের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক জানান, গেল এক মাস ধরে জেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় অর্ধেকের বেশি পাম্প চালানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি ঘন ঘন লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।