গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া এম,এ, ইউ একাডেমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রায়হান সরকারে গাফিলতির কারণে বিদ্যালয়ের প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থীর এসএসসি পরীক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তবে পরীক্ষার আগেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে আশ্বস্ত করেন প্রধান শিক্ষক মো. রায়হান সরকারে।
জানা যায়, গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া এম,এ, ইউ একাডেমিক বিদ্যালয়ের ২১২ জন শিক্ষার্থী এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। আগামী বুধবার থেকে সারাদেশে একসঙ্গে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
পরিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে এডমিট কার্ড তুলতে গিয়ে দেখেন- কারো মা-বাবার নাম ভুল, কারো ছেলের জায়গায় মেয়ে শিক্ষার্থীর ছবি। অনেকে বিজ্ঞানে পড়াশুনা করলেও এডমিট কার্ডে মানবিক বিভাগে অনুমতি এসেছে। আবার বেশ কিছু পরিক্ষার্থীর এডমিট কার্ডও আসে নাই।
পরীক্ষার্থীরা বলছেন, প্রধান শিক্ষক মো. রায়হান সরকার ফরম ফিলাপের টাকার হিসাব যেন প্রতিষ্ঠানের অন্যরা না জানে, সেজন্য তিনি বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক বা কম্পিউটার অপারেটরের সহযোগিতা না নিয়ে একটি দোকান থেকে কাজ করার কারনে শিক্ষার্থীদের এডমিটে এসব ভুল হয়েছে।
স্কুল সংশ্লিষ্টরা জানায়, চলতি মাসের ২২ তারিখ থেকে অনুষ্ঠিতব্য এসএসসি পরীক্ষায় কঞ্চিপাড়া এম,এ, ইউ একাডেমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ৬৮ জন, মানবিক বিভাগে ১৪৫ জনসহ মোট ২১২ জন অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
কয়েকদিন আগেই ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র হাতে তুলে দেয়। কিন্তু, কঞ্চিপাড়া এম,এ, ইউ একাডেমিক বিদ্যালয়ের পরিক্ষার্থীরা প্রবেশপত্র (এডমিট) তুলে দেখতে পান ভুলে ভড়া।
রোববার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়টির পরিক্ষার্থীরা ছুঁটাছুঁটি করছেন প্রবেশপত্র হাতে নিয়ে। কারও নিজের ভুল হয়েছে, কারও মা- বাবার নাম, আবার কারও ভুল ছবি। এমনকি কারও কারও ধর্মও পরিবর্তিত হয়েছে। আবার অনেক পরিক্ষার্থীর প্রবেশপত্রও আসে নাই। পরিক্ষার্থীদের এসব ভুলের কথা ছড়িয়ে পড়লে অবিভাবক ও স্থানীয়রাও আসছেন প্রতিষ্ঠানটিতে। এমত অবস্থায় বিদ্যালয়টির মাঠে সকল পরিক্ষার্থীদের চোখেমুখে ভবিষৎ অনিশ্চয়তার ছাপ লক্ষ্য করা গেছে।
এদিকে স্থানীয়রা জানায়, স্কুলের প্রধান শিক্ষক রায়হান সরকার বিগত সরকারের সময়ে এক প্রভাবশালী নেতার পরিচয় দিয়ে বহু মানুষ থেকে নানা প্রলোভনে লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করেন। গণ-অভ্যুত্থানের পর ওই নেতা দেশান্তরিত হওয়ার পর রায়হান ওই স্কুলে অনিয়মিত হয়ে ওঠেন। মাঝে মাঝে স্কুলে এলেও খাতায় হাজিরা দিয়ে চলে যান। তার এসব অনিয়ম নিয়ে কেউ কথা বলার সাহস পান না। অনেক শিক্ষকদের টাকা থেকে বঞ্চিত করতেই তিনি একাই একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ করতে গিয়ে ১৫০ জন পরিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছেন।
পরিক্ষার্থী আল আমিন ও নাজিয়া আযম বন্ধন বলেন, ‘একদিন পর পরীক্ষা। আমরা এখনো প্রবেশপত্র পাই নাই। আমাদের নাকি ফরম ফিলাপ হয়নি। আমাদের মতো অনেকেই আছে। প্রধান স্যারকে বললাম, তিনি বললেন ধৈর্য্য ধরো, সবার সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। এখন পড়াশোনা করব নাকি প্রবেশপত্র নিয়ে দুঃচিন্তা করব। কোনটাই মাথায় খেলছে না।’
পরিক্ষার্থী পিয়াল সরকার বলেন, ‘আমার নবম শ্রেনীতে ভর্তি হওয়ার সময় আমার জন্মতারিখ ভুল হয়। প্রধান শিক্ষক স্যার সংশোধনের জন্য আমার কাছে টাকা নেয়। এসএসসি পরিক্ষার এডমিট কার্ড তুলে দেখি আমার জন্মতারিখ সংশোধন হয় নাই। চিন্তায় আছি এমন কি হবে?’
বিদ্যালয়টির সাবেক সভাপতি শামসুজ্জোহা বলেন, ‘আমি গত তিন মাস আগে বিদ্যায়টির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলাম। ওই সময়ে শিক্ষার্থীদের ফরম ফিলাপের কাজ হয়েছে। এই প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কাজের জন্য যখন যে টাকার ভাউচার দিয়েছে, সেখানেই স্বাক্ষর করে দিয়েছি । তিনি প্রত্যক শিক্ষার্থীর ফরম ফিলাপের অনলাইন ও কম্পিউটারের কাজ বাবদে দুই থেকে আড়াইশ টাকা নিয়েছেন। তারপরও কেনো ভুল হবে। আমার জীবনে এমন প্রধান শিক্ষক দেখি নাই যে, নিজেই কিছু টাকা আত্নসাত করার জন্য শিক্ষার্থীদের জীবনে অনিশ্চয়তা ডেকে আনে।’
আরেক পরিক্ষার্থী হযরত আলী বলেন, ‘আমার প্রবেশপত্রে অন্য এক মেয়ের ছবি দেওয়া হয়েছে। পরিক্ষার হলে এবার যে কী হবে আল্লাহ জানে। হেড স্যারকে বললাম, স্যার বলতেছে পরিক্ষার আগে ঠিক করে দিলেই তো হলো।’
ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি অবগত হয়েছি। ওই বিদ্যালয়ের কোনো পরীক্ষার্থীই যেন পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।’