চট্টগ্রাম নগরীর ঐতিহ্যবাহী আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলায় টানা তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন মো. শরীফ, যিনি ‘বাঘা’ শরীফ নামেই পরিচিত। শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিকেলে লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত ফাইনালে তিনি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মো. রাশেদকে (রাশেদ বলী) হারান। দীর্ঘ সময় ধরে টানটান উত্তেজনার এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কৌশল ও ধৈর্যের লড়াইয়ে এগিয়ে থাকেন শরীফ।
ফাইনালে শুরু থেকেই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে সমানে সমান লড়াই হয়। কখনো শরীফ এগিয়ে যান, আবার দ্রুতই ঘুরে দাঁড়ান রাশেদ। হাতের গ্রিপ ও শরীরের ভারসাম্যের লড়াইয়ে দর্শকেরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে ছিলেন রিংয়ের দিকে। চারপাশে তখন চিৎকার আর ঢোলের শব্দে মুখর পরিবেশ। প্রায় ২৫ মিনিট ধরে চলা এই লড়াইয়ের শেষ দিকে হঠাৎ কৌশল বদলে সামনে এগিয়ে যান শরীফ।
এতে রাশেদ ভারসাম্য হারালে শক্ত এক চাল দিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দেন তিনি। রেফারির বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয় ‘বাঘা’ শরীফ।
এর আগে সেমিফাইনালে সাবেক চ্যাম্পিয়ন শাহজালাল বলীকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠেন শরীফ। অন্য সেমিফাইনালে মিঠু বলীকে মাত্র দেড় মিনিটে পরাজিত করে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেন রাশেদ বলী। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লড়াইয়ে দীর্ঘ ১৭ মিনিটের হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর জয় পান মিঠু বলী।
এ বছর প্রতিযোগিতায় অংশ নেন ১০৮ জন বলী। বয়সে তরুণ থেকে প্রবীণ সবাই অংশ নেন এই আসরে। প্রথম পর্ব শেষে আটজন কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেন। লটারির মাধ্যমে প্রতিপক্ষ নির্ধারণের পর শুরু হয় কোয়ার্টার ফাইনাল। সেখান থেকে চারজন সেমিফাইনালে জায়গা করে নেন।
বেলা তিনটার দিকে বাঁশির শব্দে বলীখেলা শুরু হয়। ঢোলের তালে তালে একে একে বলীরা রিংয়ে উঠতেই গর্জে ওঠে চারপাশ। এর আগেই দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লালদীঘি এলাকা ঘিরে মানুষের ঢল নামে। বৈশাখের তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে দর্শকেরা মাঠে ভিড় করেন। কেউ গামছা বেঁধে, কেউ ছাতা হাতে, আবার কেউ গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে খেলা শুরুর অপেক্ষা করেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এই ভিড়। মাঠের ভেতর ও বাইরে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
খেলার উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।
১৯০৯ সালে বদরপাতির ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগরের উদ্যোগে এই বলীখেলার সূচনা হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় তরুণদের শক্তি ও সাহস জাগিয়ে তুলতে এই আয়োজন শুরু হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে এটি চট্টগ্রামের অন্যতম বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবছর ১২ বৈশাখ লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এই বলীখেলা। একে ঘিরে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে বসে বৈশাখী মেলা। কেনাবেচা, আড্ডা ও মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
শত বছরের বেশি সময় পেরিয়েও এই বলীখেলা চট্টগ্রামের মানুষের আবেগের জায়গা ধরে রেখেছে। আর সেই ঐতিহ্যের মঞ্চেই আবারও নিজের আধিপত্যের ছাপ রেখে গেলেন ‘বাঘা’ শরীফ।