আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সাতক্ষীরা জেলায় কোরবানির পশুর রেকর্ড উৎপাদন হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এবার স্থানীয় চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৮ হাজার পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এই অতিরিক্ত পশু স্থানীয় বাজার ও জেলার চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় পশুর হাটে পাঠানো হবে।
তবে মাঠপর্যায়ে পশুর এই বাম্পার উৎপাদনেও মুখে হাসি নেই স্থানীয় খামারি, প্রান্তিক চাষি ও ব্যবসায়ীদের। গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সীমান্ত দিয়ে গরুর অবৈধ অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় আসল মূলধন বা বিনিয়োগ তুলে আনা নিয়েই চরম দুশ্চিন্তা আর আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, এবার সাতক্ষীরা জেলার ১২ হাজার ৮৯৪টি ছোট-বড় ও বাণিজ্যিক খামারে কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। খামারগুলোতে সম্পূর্ণ দেশীয় ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে মোটাতাজা করা হয়েছে ৪৯ হাজারের বেশি গরু, ৪৪ হাজার ছাগল এবং প্রায় ৬ হাজার ভেড়া।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উন্নত জাতের গো-প্রজনন ও খামারিদের সঠিক পরিচর্যার কারণে গত বছরের তুলনায় এবার জেলায় পশুর সামগ্রিক উৎপাদন প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জেলার পশুপালন খাতে একটি বড় সাফল্য।
উৎপাদন বাড়লেও খামারিদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। মাঠপর্যায়ের বেশ কয়েকজন খামারির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক বছরে বাজারে গমের ভূষি, খৈল, ধানের কুঁড়ো, চালের খুদ এবং শুকনো খড়সহ সব ধরনের পশুখাদ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ওষুধের খরচ ও খামার ব্যবস্থাপনার অন্যান্য ব্যয়।
খামারিদের দাবি, একটি গরুর পেছনে প্রতিদিন যে পরিমাণ টাকা গুনতে হয়েছে, সেই তুলনায় ঈদে বাজারে উপযুক্ত ও যৌক্তিক দাম না পেলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন তারা।
অনেক প্রান্তিক চাষি চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বা এনজিও থেকে লোন নিয়ে পশু পালন করেছেন, বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেলে তাদের দেউলিয়া হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
খামারিদের লোকসানের আশঙ্কার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে গরুর অনুপ্রবেশ। সাতক্ষীরা জেলাটি ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায় প্রতি বছরই কোরবানির ঈদের আগে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পশু আসার একটা প্রবণতা থাকে।
স্থানীয় খামারিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশি পশুর যেখানে রেকর্ড উৎপাদন হয়েছে, সেখানে যদি চোরাই পথে ভারত থেকে কম দামে গরু চলে আসে, তবে দেশি গরুর বাজার পুরোপুরি ধসে পড়বে। এর ফলে খামারিরা তাদের আসল পুঁজিটুকুও ঘরে তুলতে পারবে না।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এফ এম মান্নান কবীর আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমরা খামারিদের আশঙ্কার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। দেশি খামারিদের স্বার্থ সুরক্ষায় সীমান্ত দিয়ে যেকোনো উপায়ে যাতে অবৈধভাবে কোনো গরুর প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে কঠোর নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, আসন্ন কোরবানি উপলক্ষে পশুর হাটগুলোকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিনের ব্যবস্থা রাখা এবং কোনো অসুস্থ বা স্টেরয়েড দিয়ে মোটাতাজা করা পশু যাতে বিক্রি না হতে পারে সেজন্য প্রতিটি পশুর হাটে বিশেষজ্ঞ ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম নিয়োজিত থাকবে। প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ আশা করছে, সীমান্ত সুরক্ষিত থাকলে খামারিরা এবার তাদের পশুর সঠিক মূল্য পাবেন।