যে বয়সে বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সেই জীবিকার তাগিদে ভ্যানের হ্যান্ডেল ধরেছে ১০ বছরের শিশু আরমান। বাবার ছেড়ে চলে যাওয়া আর মায়ের দূরে কাজ করার কারণে ছোট দুই ভাই ও নানা-নানীর সংসারের দায়িত্ব এখন তার ছোট্ট কাঁধে।
বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার ধোপাখালী ইউনিয়নের গাফতলা গ্রামের শিশু আরমানের জীবনসংগ্রামের গল্প শুনলে যে কারও চোখে জল এসে যায়। ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতো বেরিয়ে পড়ে সে। সারাদিন ভ্যান চালিয়ে আয় করে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। সেই টাকাতেই চলে নানা-নানীর সংসার, ছোট দুই ভাইয়ের খাবার-দাবারসহ পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ।
একসময় স্থানীয় ধোপাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল আরমান। কিন্তু, অভাবের তাড়নায় থেমে যায় তার শিক্ষাজীবন।
অনেক আগেই বাবা পরিবার ছেড়ে চলে গেছেন। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মা আসমা বেগম কাজ নিয়েছেন মোংলা ইপিজেডের একটি গার্মেন্টসে কাজ ।ফলে, ছোট দুই ভাই—৫ বছরের আরিফ ও ১২ মাস বয়সী ছোট্ট আসিককে নিয়ে নানা-নানীর সংসারেই বড় হচ্ছে আরমান।
বর্তমানে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সে নিজেই। বয়সে ছোট হলেও দায়িত্ববোধে যেন অনেক বড় হয়ে উঠেছে সে।
ছোট শিশু আরমান বলে, ‘আমারও স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে। অন্য ছেলেমেয়েদের স্কুলে যেতে দেখলে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু, সংসারের জন্য ভ্যান চালাতে হয়। আমি চাই, আমার ছোট ভাইরা লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হোক।’
আরমানের মা আসমা বেগম বলেন, ‘অভাবের সংসারে বাধ্য হয়েই আমাকে দূরে কাজ করতে হচ্ছে। ছেলেকে ভ্যান চালাতে দেখে বুকটা ভেঙে যায়। আমি চাই, ও আবার স্কুলে যাক মানুষের মতো মানুষ হোক।’
আরমানের নানা আমজাদ শেখ বলেন, ‘ও খুব ছোট, কিন্তু সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। ওর উপার্জনেই আমাদের সংসার চলে। এই বয়সে এমন কষ্ট কেউ যেন না করে।’
নানি রনজিনা বেগম বলেন, ‘নাতিটার কষ্ট দেখলে চোখে পানি আসে। ভোরে বের হয়, রাতে বাড়ি ফেরে। ওরও তো এখন খেলাধুলা করার বয়স।’
স্থানীয় ভ্যানচালক আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা বড় মানুষ হয়েও অনেক সময় হাল ছেড়ে দিই। কিন্তু আরমানের সংগ্রাম দেখে অবাক হই। মাঝে মধ্যে আমরা জোর করে ওর ভ্যানে যাত্রী তুলে দিই। কারণ ও খুব অভাবে আছে। সমাজের মানুষের ওর পাশে দাঁড়ানো দরকার।’
এলাকার মানুষ ভালোবেসে তাকে ডাকে ‘ছোট আরমান’। তার পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও সংগ্রামী জীবন সবাইকে মুগ্ধ করলেও শিশুটির চোখে এখনো লুকিয়ে আছে স্কুলে ফেরার স্বপ্ন।
ধোপাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘আরমান আমাদের বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। সে পড়াশোনায় আগ্রহী ছিল। কিন্তু পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে তাকে আবারও স্কুলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
এ বিষয়ে কচুয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হাসান বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। শিশুটির পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করতে আমরা যথাযথ উদ্যোগ নেব।’
সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা পেলে হয়তো আবারও বই-খাতা হাতে স্কুলে ফিরতে পারবে ছোট্ট আরমান। ফিরে পাবে হারিয়ে যাওয়া শৈশব।
আরমানের মতো আর কোনো শিশুকে যেন জীবিকার তাগিদে শৈশব হারাতে না হয়— এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।