দীর্ঘদিন ধরে একটি পাকা সেতুর আশায় ছিলেন ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার কংশ নদী তীরবর্তী আট গ্রামের মানুষ। বছরের পর বছর জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন-নিবেদন করেও যখন কোনো সেতুর দেখা মেলেনি, তখন বাধ্য হয়েই নিজেদের অর্থায়নে বাঁশ, কাঠ ও গাছের খুঁটি দিয়ে নির্মাণ করেছেন একটি অস্থায়ী সাঁকো। প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সাঁকো এখন হাজারো মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি শুধুমাত্র একটি সাঁকো নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা, কষ্ট আর সংগ্রামের মধ্য থেকে নিজেদের উদ্যোগে গড়ে তোলা উন্নয়নের প্রতীক। বহু বছরের দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে এই সাঁকো নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে এলাকার মানুষের জন্য।
রোববার (৩১ মে) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার সদর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে কংশ নদীর ওপর নির্মিত সাঁকোটি দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ চলাচল করছেন। নিশুনিয়াকান্দা, সেনেরচর, ঝিলকি, চাতুলিয়াকান্দা, চকেরকান্দা, পুটিয়া, ঘোনাপাড়া ও মালিঝিকান্দা গ্রামের বাসিন্দারা নিয়মিত এই সাঁকো ব্যবহার করছেন।
সকালে সাঁকোটি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় যেতে দেখা যায়। একই সঙ্গে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন সহজেই। মোটরসাইকেল, ভ্যান, ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত রিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনও সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করছে এই সাঁকো দিয়ে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেতু না থাকায় এতদিন তাদের নদী পারাপারের জন্য তারা নৌকার ওপর নির্ভর করতেন। বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যেত। শিক্ষার্থীরা সময়মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারত না, রোগীদের হাসপাতালে নিতে হতো চরম ঝুঁকি নিয়ে। কৃষিপণ্য বাজারজাত করতেও অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হতো।
সেনেরচর গ্রামের বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বন্যাপ্রবণ ও নিচু এলাকার মানুষ। বছরের পর বছর ধরে অবহেলার শিকার হচ্ছি। একটি পাকা সেতুর জন্য অনেক জায়গায় আবেদন করেছি, কিন্তু কোনো ফল পাইনি। শেষ পর্যন্ত গ্রামের মানুষ নিজেরাই টাকা তুলে এই সাঁকো নির্মাণ করেছে। এখন অন্তত চলাচলের কষ্ট অনেকটা কমেছে।’
ঘোনাপাড়া গ্রামের কৃষক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অনেক ভোগান্তি হতো। পরিবহন খরচও বেশি লাগত। এখন সাঁকো হওয়ার কারণে সহজে বাজারে যেতে পারছি। কৃষকরা পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। কৃষিকাজে ব্যবহৃত ট্রলি, পাওয়ার টিলারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও এখন সহজে আনা-নেওয়া করা যাচ্ছে।’
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সাঁকো নির্মাণের ফলে এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে পণ্য সরবরাহ সহজ হওয়ায় ব্যবসার পরিধি বেড়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতও অনেক সহজ হয়েছে।
তবে গ্রামবাসীর আনন্দের মাঝেও রয়েছে শঙ্কা। বাঁশ, কাঠ ও গাছের খুঁটি দিয়ে নির্মিত এই সাঁকো স্থায়ী নয়। স্থানীয়দের ধারণা, সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে সাঁকোটি নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে নদীর স্রোত বৃদ্ধি পেলে সাঁকোটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে যেভাবে ভারী যানবাহন ও কৃষিযন্ত্র চলাচল করছে, তাতে সাঁকোর ওপর চাপও বাড়ছে। ফলে যে কোনো সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই দ্রুত সেখানে একটি স্থায়ী ও টেকসই পাকা সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে ফুলপুর উপজেলা প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, এলাকাটির গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারি অর্থায়নে একটি পাকা সেতু নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নিজেদের উদ্যোগে নির্মিত সাঁকো সাময়িকভাবে তাদের দুর্ভোগ লাঘব করলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য দ্রুত একটি পাকা সেতু নির্মাণ করা হবে। তাহলে শুধু আটটি গ্রামের মানুষই নয়, পুরো অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার হবে।