বাগেরহাটের খান জাহান আলী (রহঃ)-এর মাজার সংলগ্ন দীঘিতে কুমিরের আক্রমণে নিহত সাত বছর বয়সী শিশু ফাতেমা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করে দাফন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২ মে) দুপুরে মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই মাজার প্রঙ্গনে জানাজা শেষে দীঘির পূর্ব পাড়ের কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ মর্মান্তিক ঘটনার পর মাজারে আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দীঘিতে থাকা কুমিরের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
জানা গেছে, কুমিরের আক্রমণে নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ৯ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার ভোরে দীঘির নারী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে মাজারের খাদেম ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ফাতেমার মরদেহ উদ্ধার করেন। এর আগে সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মাজারসংলগ্ন দীঘির পূর্ব পাশের নারীঘাটে গোসল করতে নামলে দীঘিতে থাকা কুমিরটি তাকে টেনে নিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা নৌকা নিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। এর আগে গত ৮ এপ্রিল একই দীঘিতে কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যায়। সে সময় ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
মাজারের দীঘিতে হিংস্র কুমির রাখা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সর্বশেষ এ ঘটনার পর স্থানীয়রা মাজারের নিরাপত্তা জোরদার এবং কুমিরের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
বাগেরহাট পিসি কলেজের শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার বলেন, ‘‘খানজাহান আলী মাজারের কুমির আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু, মানুষের জীবন তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। মাজারে কুমিরের আক্রমণে মৃত্যু নতুন কিছু নয়। এর আগেও অনেকে কুমিরের আক্রমণে নিহত বা আহত হয়েছেন। হজরত খান জাহান আলী (রহ.) এর সময়কার ‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’ নামে পরিচিত কুমিরগুলোর বংশধর অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। পরে ভারত থেকে কুমির এনে এখানে ছাড়া হয়েছে। তাই মাজারে কুমির রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নতুন করে ভাবা উচিত বলে আমি মনে করি।’’
বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. ফকরুল আহসান বলেন, মাজারের কুমিরকে ঘিরে অনেক দর্শনার্থী মুরগি ও ছাগল মানত করেন। কিন্তু, কুমিরটি নিয়মিত পর্যাপ্ত খাবার পায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কুমির রাখতে হলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া উচিত।
বাগেরহাট শহরের ব্যবসায়ী আসলাম শিকদার বলেন, ‘মাজারের কুমির আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। আমরা চাই কুমিরটি দীঘিতেই থাকুক। তবে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং কুমিরের খাদ্য ব্যবস্থাপনাও স্বচ্ছ হতে হবে।’
মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘কুমির আমাদের খানজাহান আলী মাজারের ঐতিহ্য এবং দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দীঘির দুটি ঘাটকে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা আর ঘটবে না।’
তিনি আরও জানান, ফাতেমা আক্তারের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দীঘির পূর্ব পাড়ের কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এর আগে মাজার প্রাঙ্গণে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন বলেন, শিশু ফাতেমার এই মর্মান্তিক মৃত্যুর পর মাজারে কুমির রাখার বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে দীঘির দুটি ঘাটকে নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ করে ফেন্সিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে কুমির ঘাটের কাছে আসতে না পারে। পাশাপাশি চিড়িয়াখানার আদলে একটি নির্দিষ্ট বেষ্টনীর মধ্যে কুমিরটিকে রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য, মাজার কর্তৃপক্ষ ও খাদেমদের সঙ্গে আলোচনা করে কুমিরটিকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়েও মতবিনিময় হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।