দখল, দূষণ ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কুষ্টিয়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ গড়াই খাল। বিভিন্ন স্থানে খাল ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ার কারণে কমে গেছে পানিপ্রবাহ। কোথাও খালের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে স্থাপনা, আবার কোথাও জমেছে ময়লা-আবর্জনা ও পলি।
ফলে বর্ষা মৌসুমে কুষ্টিয়া শহর ও আশপাশের এলাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। একই সঙ্গে হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৪৯ সালে স্থানীয় জলপথ সম্প্রসারণ এবং মিরপুর উপজেলার আংশিক কৃষিজমির জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্দেশ্যে গড়াই খাল খনন করা হয়। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধানে থাকা খালটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ২০১৮ সালে অনাপত্তিপত্রের মাধ্যমে কুষ্টিয়া পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
একই বছর প্রায় ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে খালটি পুনরুদ্ধার ও সৌন্দর্যবর্ধনের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় খাল পুনঃখনন, দুই তীরে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ এবং খালে মাছ ও হাঁস চাষের পরিকল্পনা ছিল। তবে পরিকল্পনাগত দুর্বলতা, বাস্তবায়ন জটিলতা ও ঠিকাদারি গাফিলতির কারণে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রায় সাড়ে আট কিলোমিটার দীর্ঘ গড়াই খালটি কুষ্টিয়া পৌরসভার কমলাপুর, মঙ্গলবাড়িয়া বাজার, উদিবাড়ি, বাড়াদি, চৌড়হাস মন্দিরপাড়া, চেচুয়া, ফুলবাড়িয়া, জগতি, বাইপাস হয়ে মিনাপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খালের বিভিন্ন অংশে প্লাস্টিক, পলিথিন ও গৃহস্থালি বর্জ্যের স্তূপ জমে আছে। অনেক স্থানে পানির রং কালচে হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কোথাও আবর্জনা ও পলি জমে পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আবার খালের বিভিন্ন অংশ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা খায়রুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এতে খাল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বর্ষাকালে পানি দ্রুত নামতে না পারায় আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
আরেক বাসিন্দা বসু দেব বলেন, খালের জায়গা দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় খালের নাব্যতা কমে গেছে। বর্ষা এলেই এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত খালটি দখলমুক্ত করে পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া না হলে পানি নিষ্কাশন সংকট আরও তীব্র হবে। পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে গড়াই খাল সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
পরিবেশবীদ কবিরুল ইসলাম বলেন, গড়াই খালকে দখল ও দূষণমুক্ত করার পাশাপাশি নিয়মিত খননের উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও বিপর্যস্ত হবে এবং পরিবেশের ক্ষতি বাড়তে থাকবে।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বলেন, পানি নিষ্কাশনের জন্য গড়াই খাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে খালটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কুষ্টিয়া পৌরসভার কাছে রয়েছে। প্রয়োজন হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড কারিগরি ও অন্যান্য বিষয়ে সহযোগিতা করবে।
কুষ্টিয়া পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, গড়াই খাল পুনরুদ্ধারে একসময় একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি দল সম্ভাব্যতা যাচাই করেছিল। তবে সেটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি। খালটি কীভাবে পুনরায় সচল করা যায়, সে বিষয়ে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।