বাবা-মাকে হারানোর শোক, দারিদ্র্য আর নানা প্রতিকূলতা—কোনোটিই থামাতে পারেনি অদম্য মেধাবী অরিত্র সরকারকে। কোনো প্রাইভেট বা কোচিং ছাড়াই এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। বাগেরহাট শহরের আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অরিত্রের এই সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও প্রতিবেশীদের মধ্যে আনন্দ বিরাজ করছে। তবে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
অরিত্রর বাড়ি বাগেরহাট শহরের শালতলা এলাকায়। টিনশেডের ছোট একটি ঘরে বড় ভাই অর্ণব সরকারকে নিয়ে তার বসবাস। দুই ভাইয়ের মধ্যে অরিত্র ছোট। তাদের বাবা উৎপল সরকার টোলকু বাড়ির সামনে একটি চা-পানের দোকান চালাতেন। সেই দোকানের আয়েই চলত তাদের সংসার।
অরিত্র জানায়, ২০২২ সালে হঠাৎ তার বাবা মারা যান। এর দুই বছর পর ২০২৪ সালে বড় ভাই অর্ণবের এসএসসি পরীক্ষা চলাকালে মারা যান মা নমিতা সরকার। অল্প সময়ের ব্যবধানে বাবা-মাকে হারিয়ে দুই ভাই হয়ে পড়েন পিতৃমাতৃহীন। এতে তাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
তবে অভাবের কাছে হার মানেনি দুই ভাই। আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতার পাশাপাশি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী উপার্জন করে তারা পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যান। বাবার রেখে যাওয়া দোকানটি অর্থসংকটের কারণে ভাড়া দিতে না পারায় বন্ধ করে দিতে হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি অরিত্র নিজেও শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াত। তবে এসএসসি পরীক্ষা সামনে এলে প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ করে পুরোপুরি পড়াশোনায় মনোযোগ দেয়।
অরিত্র বলেন, ‘দারিদ্র্যের কারণে কোনো প্রাইভেট বা কোচিং করার সুযোগ হয়নি। বাসায় বসে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পড়াশোনা করেছি। এভাবেই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছি। পড়াশোনায় বড় ভাই, আত্মীয়-স্বজন ও শিক্ষকদের সহযোগিতা পেয়েছি।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে অরিত্র জানায়, বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল সে প্রকৌশলী হবে। সেই স্বপ্ন পূরণে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে চায় সে। তবে অর্থের অভাবে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও পরবর্তী পড়াশোনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে। সরকার ও সমাজের বিত্তবানরা পাশে দাঁড়ালে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে বলে আশা তার।
অরিত্রর বড় ভাই অর্ণব সরকার বলেন, ‘ছোট ভাইয়ের সাফল্যে আমরা খুব খুশি। কিন্তু এই আনন্দের মধ্যেও কষ্ট আছে। আমার এসএসসি পরীক্ষা চলাকালে মা মারা যান। মায়ের মৃত্যুর শোক নিয়েই আমাকে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল ছোট ভাই প্রকৌশলী হবে। ওর পড়াশোনা চালিয়ে নিতে সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চাই।’
প্রতিবেশী গোপাল সাহা বলেন, বাবা-মাকে হারানোর পরও অরিত্র লেখাপড়া ছাড়েনি। কোনো প্রাইভেট বা কোচিং ছাড়াই ভালো ফলাফল করায় সবাই খুবই খুশি। অরিত্রের মতো দরিদ্র মেধাবীদের পড়াশোনা যাতে অর্থের অভাবে বন্ধ না হয়, সেজন্য সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
বাগেরহাট আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কাজী মোতাছিমুল হক বলেন, বাবা-মাকে হারিয়েও অরিত্র লেখাপড়া ছাড়েনি। দারিদ্র্যের মধ্যেও তার ইচ্ছাশক্তির জোরে ভালো ফলাফল করেছে। ভবিষ্যতে সে যাতে আরও ভালো করতে পারে এবং অর্থের অভাবে তার পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সেজন্য সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের অরিত্রর পাশে দাঁড়ানো উচিত।