জন্মনিবন্ধন থেকে মাতৃত্বকালীন ভাতা, জেলেদের বরাদ্দের চাল থেকে গ্রাম পুলিশের ট্যাক্স, ইউপি সদস্যদের সম্মানী থেকে উন্নয়নকাজ—সরকারি সেবা ও বরাদ্দের প্রতিটি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা দিতে আফসার উদ্দিনকে। এমনই অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
জানা গেছে, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) আফসার উদ্দিন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত নিয়মে সেবা পেতে গেলেও বিভিন্ন অজুহাতে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করা হয়। অতিরিক্ত টাকা না দিলে কাজ আটকে রাখা, বারবার ইউনিয়ন পরিষদে ঘোরানো এবং সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়।
এক বছর ধরে সন্তানের জন্মনিবন্ধন করাতে ইউনিয়ন পরিষদে ঘুরছেন চরলক্ষ্মী গ্রামের সুমি বেগম। তার দাবি, ইউপি সচিব সচিব আফসার উদ্দিন তাকে শূন্য বয়সী আরেকটি শিশুকে সঙ্গে নিয়ে আসতে বলেন। সেটি না করায় সন্তানের জন্মনিবন্ধন আরও ছয় মাসেও হবে না বলে জানানো হয়।
সুমি বেগমের আরও অভিযোগ, একপর্যায়ে সচিব তার জন্মনিবন্ধনের কাগজপত্র টেবিল থেকে নিচে ফেলে দেন এবং তাকে ধমক দেন।
ফেরদৌসী বেগম বলেন, তার তিন ছেলের একজনেরও জন্মনিবন্ধন করাতে পারেননি। বারবার ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। তার অভিযোগ, সচিব চাঁদপুর থেকে ব্লাড টেস্ট করিয়ে আনতে বলেছেন। এতে প্রায় ৮ হাজার টাকা খরচ হবে। কিন্তু সেই টাকা জোগাড় করতে না পারায় অসহায় অবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় ঘুরছেন তিনি।
মুহাম্মদ টিটুর অভিযোগ, চার বছর বয়সী মেয়ের জন্মনিবন্ধন করাতে গেলেও তাকে শূন্য বয়সী আরেকজন শিশুকে সঙ্গে নিয়ে আসতে বলা হয়। সেটি সঙ্গে না আনায় তাকে বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মাতৃত্বকালীন ভাতাতেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আফসার উদ্দিনের বিরুদ্ধে। তাসলিমা নামে এক নারী অভিযোগ করে বলেন, মাতৃত্বকালীন ভাতা পেতে তার কাছ থেকে ১ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, এভাবে আরও অনেকের কাছ থেকেও টাকা নেওয়া হয়েছে।
৪ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ সিরাজ সরদারের অভিযোগ, গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে আদায় করা ট্যাক্সের বরাদ্দ থেকে পাওয়া সম্মানীর একটি অংশ সচিব নিজের জন্য নিয়ে যান।
দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবুল হাসেম অভিযোগ করে বলেন, এমন কোনো খাত নেই যেখানে সচিব অতিরিক্ত টাকা নেন না। বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দের ক্ষেত্রে ভ্যাট-ট্যাক্স ও অন্যান্য নির্ধারিত অর্থের বাইরে বাড়তি টাকা দিতে হয়।
তার দাবি, একটি বরাদ্দের কাজের ক্ষেত্রে ভ্যাট-ট্যাক্স ও অন্যান্য খরচের বাইরে আরও ২০ শতাংশ টাকা নেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তিনি ফেসবুক লাইভে প্রতিবাদ করলে ১০ শতাংশ টাকা ফেরত দেওয়া হয়। তবে বাকি ১০ শতাংশ এখনো ফেরত পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
জেলেদের বরাদ্দের চালও মেরে খাওয়ার অভিযোগ রয়েছে আফসার উদ্দিনের বিরুদ্ধে। ইউপি সদস্য আবুল হাসেম জানান, জেলেদের জন্য ৪০ কেজি করে চাল বরাদ্দ থাকলেও তাদের দেওয়া হচ্ছে ৩২ কেজি করে।
এ ছাড়া মাসিক বিজিএফের চাল বিতরণের সময় সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে বাড়তি ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এবারই প্রথম নয়। ২০২৫ সালেও দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আফসার উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল।
তখন অভিযোগ ছিল, ইউপি চেয়ারম্যান হজে যাওয়ার সুযোগে তার স্বাক্ষর জাল করে সরকারি বরাদ্দের প্রায় ২৩ লাখ টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করা হয়। একই সময়ে জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া ভিজিএফ কার্ড, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, জেলেদের চাল, ট্রেড লাইসেন্স ও জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া এবং দুর্ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
এসব বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) আফসার উদ্দিনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন এবং পরে কথা বলবেন বলে জানান।
দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু জাফর মো. সালেহ বলেন, ‘জন্মনিবন্ধন নিয়ে এর আগেও কিছু অভিযোগ পেয়েছিলাম। তখন সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। এখন নতুন করে অভিযোগ আসায় বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।’
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, গ্রাহকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ বা এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।