নাজিরারটেক শুঁটকি মহাল
কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক শুঁটকি মহালে ঝোড়ো হাওয়ায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সোমবার (১৭ আগস্ট) দিবাগত রাতে কয়েক মিনিটের তীব্র বাতাসে শুঁটকি মহালের অন্তত ১৫ থেকে ২০টি উৎপাদন ঘর ও দোকান বিধ্বস্ত হয়েছে।
একই সঙ্গে মাচায় শুকাতে দেওয়া ও গুদামে সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ কাঁচা ও প্রক্রিয়াজাত মাছ উড়ে এবং বৃষ্টির পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, এতে প্রায় এক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে নাজিরারটেক এলাকায় হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়া শুরু হয়। রাতভর বৃষ্টি ও দমকা বাতাসে শুঁটকি মহালের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবুল হান্নান জানান, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত নিম্নচাপটি আরও ঘনীভূত হয়েছে। এর প্রভাবে কক্সবাজারসহ দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি রয়েছে।
তিনি বলেন, নিম্নচাপের কারণে গত কয়েকদিন ধরে কক্সবাজারে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো বা দমকা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। সোমবার মধ্যরাতে নাজিরারটেকে যে বাতাস হয়েছে, সেটিও ছিল ঝোড়ো হাওয়া। বৃষ্টির কারণে আগে থেকেই এলাকার মাটি নরম ছিল। ফলে বাতাসের আঘাতে বেশ কিছু ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।
নাজিরারটেক মৎস্য ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, সোমবার রাত থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। মধ্যরাতে হঠাৎ ভারি বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসের তীব্রতা বেড়ে যায়। একপর্যায়ে বাতাসের তোড়ে শুঁটকি পল্লীর আড়তের চালা উড়ে যেতে থাকে। অনেক ঘরের চালা ও মাচায় শুকাতে দেওয়া মাছও বাতাসে উড়ে যায়।
মহাল মালিক শফিকুল ইসলাম বলেন, বাতাসের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, প্রথমে অনেকেই মনে করেছিলেন পাশের বিমানবন্দরে জরুরি কোনো বিমান ওঠানামা করছে। ভোরে আলো ফুটলে দেখা যায়, পলিথিন দিয়ে ঢেকে শুকাতে রাখা ছুরি শুঁটকি, লইট্যা, ফাইস্যা, চইক্কা ফাইস্যা ও পোপাসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ এবং ঘরের চালা উড়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মাছগুলো বৃষ্টির পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে।
ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ জানান, ঝড়ের আঘাতে ১৫ থেকে ২০টি ঘর ও দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাচায় শুকাতে দেওয়া ও গুদামে সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ মাছও নষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক কোটি টাকা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজার উপকূলে অবস্থানরত মাছ ধরার ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত গভীর সমুদ্রে বিচরণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিম্নচাপের প্রভাবে কক্সবাজারসহ উপকূলীয় এলাকায় আরও বৃষ্টিপাত ও দমকা হাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
নাজিরারটেক শুঁটকি মহাল কক্সবাজারের অন্যতম বৃহৎ শুঁটকি উৎপাদনকেন্দ্র। শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে প্রায় ১০০ একর বালুচরজুড়ে গড়ে উঠেছে এই শুঁটকি মহাল। প্রতি মৌসুমে এখানে মাছের গুঁড়াসহ বিভিন্ন জাতের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন শুঁটকি উৎপাদন হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি নাজিরারটেকের শুঁটকি বিদেশেও রপ্তানি করা হয়।
নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলে বৈরী আবহাওয়া অব্যাহত থাকায় শুঁটকি ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।