জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনট উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক মো. মতিয়ার রহমান ফকিরকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়ে বিদ্যালয় মাঠে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে।
এসময় তারা জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে বিদ্যালয়ে তালা দিয়ে দেয়। খবর পেয়ে কালাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মুনছুর রহমান বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে তারা একটি লিখিত অভিযোগ শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দেয়। পরে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ফিরে যায়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বাদল হোসেন বলে, ‘অফিসে ঢুকে আমাদের স্যারকে চড় মারা হয়েছে। আমরা এ ঘটনার নিন্দা জানাই। যারা এ ঘটনায় জড়িত, তাদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির দাবি জানাই।’
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল ১০টার পর দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের নিয়ে বিদ্যালয়ে একটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এতে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোসলেম উদ্দিনের সঙ্গে পুনট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল কুদ্দুস ফকির উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এর জেরে বুধবার সকালে (১৯ আগস্ট) সকালে পুনট ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের ইয়াসিন আলীসহ ২০ থেকে ২৫ জন বিদ্যালয়ে যান। একপর্যায়ে কয়েকজন প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ঢুকে তাকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ সময় শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়ে বিক্ষোভ শুরু করলে ওই ব্যক্তিরা বিদ্যালয় থেকে চলে যান। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রধান শিক্ষকের কক্ষে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাকে লাঞ্ছিত ও টেনে বাইরে নেওয়ার চেষ্টার দৃশ্য দেখা গেছে। ফুটেজ অনুযায়ী, বুধবার সকাল ১০টা ৫৩ মিনিটে প্রধান শিক্ষক কক্ষে বসে দাপ্তরিক কাজ করছিলেন। এ সময় লুঙ্গি পরা এক ব্যক্তি কক্ষে ঢুকে তার সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে চড় মারেন। প্রধান শিক্ষক চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালে ওই ব্যক্তি তাকে টেনে বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে আরও কয়েকজন কক্ষে ঢুকে তাকে বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তাকে বের করতে পারেননি।
বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক মো. মতিয়ার রহমান ফকির বলেন, ‘অভিভাবক সমাবেশে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোসলেম উদ্দিনের সঙ্গে তার নিকটাত্মীয় পুনট ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল কুদ্দুস ফকির এসেছিলেন। আমরা তাকে দাওয়াত করিনি। কে বা কারা সমাবেশের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন। পরে বুধবার সকালে আমি কক্ষে বসে কাজ করার সময় ইয়াসিন আলী গালিগালাজ করতে করতে এসে আমাকে লাঞ্ছিত করেন।’
তবে প্রধানশিক্ষককে চড় মারার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইয়াসিন আলী। তিনি বলেন, ‘এখন বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। অথচ বিদ্যালয়ের অভিভাবক সমাবেশে বিএনপির কাউকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি প্রধান শিক্ষক। আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুল কুদ্দুসকে কেন অভিভাবক সমাবেশে আনা হয়েছে, এ বিষয়ে জবাব চাইতেই আমরা বিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম।’
কালাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মুনছুর রহমান বলেন, মঙ্গলবার পুনট উচ্চবিদ্যালয়ে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের নিয়ে সমাবেশ করা হয়। সেখানে একটি রাজনৈতিক দলের নেতার উপস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এর জেরে বুধবার কয়েকজন বহিরাগত বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। শিক্ষার্থীরা ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, অভিভাবক সমাবেশে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল কুদ্দুস ফকিরের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে প্রধানশিক্ষককে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটেছে। তবে এ ঘটনায় এখনো থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ বলেন, শিক্ষার্থীদের একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। দ্রুত তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।