নেই ছাউনি
আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামলেই শুরু হয় যাত্রীদের ছোটাছুটি। আবার প্রখর রোদেও স্বস্তি নেই। কেউ ছুটছেন টিকিট কাউন্টারের দিকে, কেউ দোকানের নিচে, আবার কেউ আশ্রয় নিচ্ছেন ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। কিন্তু ট্রেনের ঘোষণা এলেই সেই আশ্রয় ছেড়ে ছুটতে হয় আবার সেই খোলা আকাশের নিচে ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। কারণ ট্রেন ক্রসিং হলে বিপরীত দিকের ট্রেনটি দাঁড়ায় সেখানেই। ট্রেন আসার পর গিয়ে ওঠার সুযোগ থাকে না। যার কারণে ২০ থেকে ৩০ মিনিট আগেই সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের।
জয়পুরহাটের আক্কেলপুর রেলস্টেশনের প্রায় ৩৫০ মিটার দীর্ঘ ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে নেই কোনো যাত্রী ছাউনি। যার কারণে যার কারণে তীব্র রোদ ও বৃষ্টিতে বিপাকে পড়তে হয় যাত্রীদের। বৃষ্টি নামলে ভিজে যায় যাত্রীদের কাপড়, ব্যাগ, কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
অন্যদিকে রোদের সময় প্রচণ্ড গরমে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে দুর্ভোগ আরও বাড়ে। কোথাও দাঁড়ানোর মতো নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক জায়গা না থাকায় আবহাওয়া যেমনই হোক, অপেক্ষা করতে হয় ট্রেনের জন্য। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী যাত্রীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের দীর্ঘ অংশজুড়ে যাত্রীদের জন্য কোনো স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা নেই। বৃষ্টি শুরু হলে নিরাপদ জায়গার খোঁজে ছুটতে থাকেন যাত্রীরা। কেউ দোকানের নিচে, কেউ টিকিট কাউন্টারের আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। তীব্র রোদেও অনেকে একই জায়গায় ছায়ার খোঁজ করেন। তবে ট্রেন আসার ঘোষণা হলেই আবার ছুটতে হয় প্ল্যাটফর্মে। ফলে বৃষ্টি কিংবা রোদের মধ্যে শিশু ও রোগীদের নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে তৈরি হয় বাড়তি ভোগান্তি।
রেলওয়ে সূত্র ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আক্কেলপুর স্টেশন দিয়ে আপ-ডাউন মিলিয়ে প্রতিদিন ২০-২২টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। প্রতিদিন প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার যাত্রী এ স্টেশন ব্যবহার করেন। ট্রেন ক্রসিংয়ের কারণে সপ্তাহে গড়ে ২৫ থেকে ২৮ বার ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দাঁড়ায়। ওই সময় প্ল্যাটফর্মটিতে যাত্রীদের চাপও বেড়ে যায়।
বৃষ্টি ও রোদের সময় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন অসুস্থ রোগী, প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ও শিশুদের নিয়ে যাওয়া স্বজনরা। একদিকে রোগী সামলাতে হয়, অন্যদিকে ব্যাগ, চিকিৎসার কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাঁচাতে হয়। দূরের হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাওয়া রোগীদের ভোগান্তি আরও বেশি। বৃষ্টিতে প্রেসক্রিপশন, চিকিৎসার রিপোর্ট, ওষুধ, কাপড় ও সঙ্গে নেওয়া খাবার ভিজে যায়। আবার রোদের মধ্যে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলে অসুস্থ ও বয়স্ক যাত্রীদের শারীরিক কষ্ট বেড়ে যায়। ট্রেন আসার সময় ভিড়ের মধ্যে পানি মাড়িয়ে কিংবা প্রচণ্ড গরমে দ্রুত ট্রেনে উঠতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে।
ট্রেনের জন্য প্রায় ৩০ মিনিট ধরে ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছেন পালপাড়া এলাকার বাসিন্দা মীর শাহে আলী। নাগরিক প্রতিদিনকে তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি শুরু হলে এখানে দাঁড়িয়ে থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। আবার রোদেও ছায়া পাওয়া যায় না। ছোট বাচ্চা, বয়স্ক বা রোগী সঙ্গে থাকলে দুর্ভোগের শেষ থাকে না। বৃষ্টিতে কাগজপত্র, ব্যাগ ও খাবার ভিজে যায়, আর রোদের মধ্যে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেও কষ্ট হয়।‘
চিকিৎসার জন্য পঞ্চগড় যাচ্ছিলেন রওশন আরা। তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘রোগী নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে খুব কষ্ট হয়। একদিকে রোগী সামলাতে হয়, অন্যদিকে ব্যাগ ও কাগজপত্র বাঁচাতে হয়। রোদের সময়ও রোগী নিয়ে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন। একটা ছাউনি থাকলে এত কষ্ট করতে হতো না।‘
স্থানীয় বাসিন্দা বকুল সরদার বলেন, ‘যে প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে ট্রেনের অপেক্ষা করেন, সেখানে ছাউনি নেই- এটা মেনে নেওয়া যায় না। বৃষ্টি হলেই যাত্রীদের ছোটাছুটি করতে হয়। আবার রোদের সময়ও অনেকে ছায়ার জন্য এদিক-ওদিক ছুটছেন। দ্রুত এখানে ছাউনি নির্মাণ করা দরকার।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ছাউনি থাকলেও ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের যাত্রীদের জন্য নেই কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা। অথচ ট্রেন ক্রসিংয়ের কারণে নিয়মিত ওই প্ল্যাটফর্মেই ট্রেন দাঁড়ায়। ফলে ছাউনি না থাকলেও যাত্রীদের বাধ্য হয়েই সেখানে আগে থেকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে অন্তত একটি অংশে হলেও দ্রুত ছাউনি নির্মাণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বর্ষা ও গরমের সময়ে এ দুর্ভোগ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
আক্কেলপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার হাসিবুল হাসান নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে জায়গা সংকটের কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে যাত্রীরা প্রায়ই এসে অভিযোগ করেন। তাদের এই দুর্ভোগ দেখে আমাদেরও খারাপ লাগে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা বেশ কয়েকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় চারটি ট্রেন ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ায়।’