জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া থাকে একটু নিরাপদ আশ্রয়, দুবেলা খাবার আর শান্তিতে বেঁচে থাকা। কিন্তু জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের গুতু মণ্ডল ও সুন্দরী বেগমের জীবনে সেই চাওয়াগুলোও যেন বিলাসিতা। নিজেদের বলতে নেই এক টুকরো জমি, নেই মাথা গোঁজার মতো একটি ঘর। তাই পাকা সড়কের পাশে টিন, বাঁশ ও পলিথিনে ঘেরা ছোট্ট একটি ঝুপড়িই গত পাঁচ বছর ধরে তাদের ঠিকানা।
উপজেলার জটিয়ারপাড়া-মাহমুদপুর বাজার সড়কের মহিষবাথান এলাকায় ঝড়-বৃষ্টি, তীব্র গরম কিংবা শীত—সব প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই দিন কাটছে এই বৃদ্ধ দম্পতির। রাস্তার পাশের ঝুপড়িতে কখনো দিন কাটে অনাহারে, কখনো আবার কারও দেওয়া খাবারেই জোটে দুজনের আহার।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ব্যস্ত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে জরাজীর্ণ একটি ছোট্ট ঝুপড়ি। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, সেখানে মানুষের বসবাস। ভেতরে পুরোনো একটি খাট, কয়েকটি হাঁড়ি-পাতিল, কিছু কাপড়চোপড় ও রান্নার সামান্য সরঞ্জাম। একপাশে মাটির চুলা। বৃষ্টি হলেই ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ে ভিজে যায় ঘরের মেঝে। তখন ঘুমানোর চেয়ে পানি ঠেকানোর চিন্তাই বড় হয়ে দাঁড়ায়।
গুতু মণ্ডল একসময় গাছ কাটার কাজ করতেন। দিনমজুরির সামান্য আয়েই চলত সংসার। কিন্তু বয়স আর অসুস্থতা কেড়ে নিয়েছে তার কর্মক্ষমতা। এখন ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। ফলে সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়েছে স্ত্রী সুন্দরী বেগমের কাঁধে।
প্রতিদিন সকাল হলেই মানুষের দ্বারে দ্বারে বের হন সুন্দরী। কেউ পাঁচ টাকা দেন, কেউ দশ টাকা। কোনো দিন একটু বেশি, আবার কোনো দিন প্রায় খালি হাতেই ফিরতে হয়। সেই সামান্য টাকায় চাল-ডাল কিনে দুজনের খাবার জোটে। স্বামীর ওষুধ কেনার টাকাও অনেক সময় থাকে না।
সুন্দরী বেগম বলেন, ‘সকাল থেকে বের হই। কেউ পাঁচ টাকা দেয়, কেউ দশ টাকা দেয়। কোনো দিন একটু বেশি পাই, কোনো দিন কম পাই। যা পাই, তা দিয়ে চাল-ডাল কিনে খাই। স্বামীর অসুখের ওষুধ কেনার সামর্থ্য অনেক সময় থাকে না।’
পাশে বসে থাকা গুতু মণ্ডল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘এখন আর কোনো কাজ করতে পারি না। শরীর ভেঙে গেছে, বয়সও হয়েছে। জীবনের শেষ সময়ে একটা ঘর থাকলে অন্তত শান্তিতে থাকতে পারতাম।’
স্থানীয়রা জানান, গুতু মণ্ডলের বাবা সিরাজ মণ্ডল জীবিত অবস্থায় তাদের সব জমিজমা বিক্রি করে দিয়েছিলেন। ফলে উত্তরাধিকার সূত্রেও কোনো জমি পাননি গুতু। পরে দিনমজুরের কাজ করে জীবন চালালেও বয়স ও অসুস্থতার কারণে সেটিও আর সম্ভব হয়নি। প্রথম স্ত্রীর ঘরে তার একটি ছেলে থাকলেও তিনি বাবা ও সৎমায়ের খোঁজ নেন না বলে দাবি প্রতিবেশীদের।
স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর হোসাইন বলেন, ‘বৃদ্ধ মানুষ দুজনকে দেখলে খুব খারাপ লাগে। ঝড়-বৃষ্টির সময় আমরা ভয় পাই, তাদের ঘর টিকবে কি না। অনেক সময় এলাকার মানুষ মিলে খাবার দিই। কিন্তু এভাবে তো স্থায়ী সমাধান হবে না।’
মিজানুর রহমান নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘সরকার অসহায় মানুষের জন্য অনেক প্রকল্প চালু করেছে। কিন্তু এই পরিবারটি এখনো কোনো স্থায়ী আবাসনের সুযোগ পায়নি। তাঁদের জন্য দ্রুত কিছু করা প্রয়োজন।’
শুধু দারিদ্র্য নয়, নিরাপত্তাহীনতাও এই দম্পতির নিত্যসঙ্গী। ব্যস্ত সড়কের পাশে ঝুপড়িতে বসবাস করায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছেন তারা। এর ওপর ঝড় কিংবা ভারী বৃষ্টি হলে ঘরটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এ বিষয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী বলেন, ‘বৃদ্ধ দম্পতির বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। তাদের জন্য সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।’
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম খালেক বলেন, ‘তাদের অবস্থা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কড়ইচড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।’