উত্তরের হিমেল বাতাসে জবুথবু হয়ে পড়েছে লালমনিরহাটের গ্রাম থেকে শহর সবখানে। এর মধ্যে আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা তিস্তা নদীর চরে শীত আরও নির্দয়। খোলা প্রান্তর, নদীর হাওয়া আর কুয়াশার ভেজা ঠান্ডা একসঙ্গে মানুষের শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় লালমনিরহাটে সর্বনিম্ন ১১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে বলে রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র জানিয়েছেন।
‘শীতের ঠ্যালায় ঘর থাকি বাইরা বের হওয়া যায় না। বাইরা বের হইলে বাতাস গাত ফোরে ফোরে সোন্দায় (বাতাস গায়ের ভেতর ছুঁচের মত ফোঁড়ায়)।’ কথাগুলো বলছিলেন লালমনিহাটের আদিতমারী উপজেলার ভাদাই গ্রামের নজু মিয়া। ৫৫ বছর বয়সী এ কৃষক কাঁপতে থাকা দুই হাত ঘষে শরীরে একটু উষ্ণতা ফেরানোর চেষ্টা করছিলেন।
পৌষের ১১ দিন যেতে না যেতেই হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশায় লালমনিরহাটের জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। টানা তিন দিন সূর্যের দেখা নেই। রাতে কুয়াশা ঝরছে বৃষ্টির মতো।
সূর্যের আলোর বদলে লালমনিরহাটের ভোর আসে ধূসর কুয়াশা নিয়ে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া ঠান্ডা হাওয়া ঘুম ভাঙিয়ে দেয় আগেই। উঠোনের ভেজা মাটি আর কনকনে বাতাসে মনে হয় যেন পুরো জনপদ থমকে আছে। এই বৈরী আবহাওয়ার ভেতরই প্রতিদিন নতুন করে বাঁচার জন্য লড়াই করেন লালমনিরহাটের মানুষ। বিশেষ করে নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল আর প্রান্তিক গ্রামগুলোতে মানুষের ভোগান্তি বাড়ে বহুগুণ।
চরের বাসিন্দা মাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘ঠান্ডায় আর জীবন চলে না বাহে। জমির কাজ ঠিকমতো করতে পারছি না। আলু ক্ষেতে পানি দেওয়া দরকার, কিন্তু এই ঠান্ডায় শরীর সায় দেয় না।’
চরের অনেক ঘরেই নেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র। রাতে আগুন জ্বালিয়ে, খড়কুটো জড়ো করে কিংবা একখানা কম্বল ভাগাভাগি করে রাত কাটে পুরো পরিবারের। শীত বাড়ার ফলে কমে গেছে কাজের সুযোগ। অনেকে কাজে যেতে পারছে না। দিন মজুরদের অনেকেই সকালে কাজের আশায় বের হয়েও ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে।
কাকিনা বাজারের রিকশাচালক মিলম মিয়া বলেন, ‘রিকশার হাতলে হাত রাখা যায় না। হাত-পা নিস্তেজ হয়ে যায়। খুব কষ্টে একবেলা রিকশা চালাই। আয়ও কমে গেছে।’
লালমনিরহাট ট্রাক স্ট্যান্ডের চালক রজব আলী জানায়, ‘ঘন কুয়াশায় যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পরিবহন শ্রমিকদের দুর্ভোগও বাড়ছে। রাতে গাড়ি চালানো যায় না। কুয়াশার কারণে দিনের বেলাতেও হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরে চালাতে হয়।’
আগামী কয়েকদিন এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ মিলবে না বলে জানিয়েছেন রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র।