অনলাইন কেনাবেচার জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম দারাজ ডটকমের নামে ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন কেনাবেচার জগতে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে তারা লোভনীয় অফারের ফাঁদ পাতছে। শুরুতে অল্প অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করে পরে ধাপে ধাপে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে একপর্যায়ে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় ওই চক্র।
সচেতনতার অভাব কিংবা ঝামেলা এড়াতে অনেক ভুক্তভোগী আইনি পদক্ষেপ নিতে অনিহা দেখালেও সম্প্রতি চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় এই বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
একাধিক ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দারাজের আদলে তৈরি করা একটি ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ করা হয়। শুরুতে স্বল্প মূল্যের পণ্য কেনার জন্য উৎসাহিত করা হয় গ্রাহকদের। ওয়েবসাইটটিতে ‘একটি কিনলে একটি ফ্রি’, নামী-দামি ব্র্যান্ড ও বিভিন্ন কোম্পানির পণ্য অস্বাভাবিক কম দামে অফারের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। বিশেষ করে রাতের কিছু সময় সীমিত অফার প্রকাশ করে দ্রুত অর্ডার দিতে প্রলুব্ধ করা হয়। এভাবে পরিকল্পিত ফাঁদে পা দিয়ে অনেক গ্রাহক সর্বস্ব হারাচ্ছেন অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথমে ১০০ টাকার জুয়েলারি কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বলা হয়। পরে সেই পণ্যই কয়েকগুণ দামে গ্রাহকের কাছ থেকে কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে সহজ লাভের আশায় গ্রাহকরা ধীরে ধীরে বেশি দামের পণ্য কিনতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে যখন লেনদেনের অঙ্ক বড় হয় এবং এক পর্যায়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে গ্রাহককে ফোন, মেসেজ ও অনলাইন মাধ্যম থেকে ব্লক করে দেয় চক্রটি।
গত ২৯ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, এক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে চক্রটি সরাসরি ৮৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রতিশ্রুত লাভসহ মোট টাকার পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
সূত্র জানায়, প্রতারক চক্রটির একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে থেকে এই অসাধু কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। ঢাকায়ও তাদের একটি সক্রিয় গ্রুপ রয়েছে। তবে তাদের রাতের তাদের কার্যক্রম বেশি সক্রিয় থাকে। ওই সময় অফারও থাকে বেশি। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে একাধিক ভুক্তভোগী এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ করেছেন।
নগরের হামজারবাগ এলাকার এক ভুক্তভোগীর স্বামী মো. এরশাদ বলেন, ‘আমার স্ত্রী দারাজ ডটকমের নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্য কেনাবেচা করছিল। শুরুতে লাভ পেলেও পরে টাকার পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। বাধ্য হয়ে আমরা থানায় অভিযোগ করেছি।’
দারাজের নামে ভুয়া ওয়েবসাইটে প্রতারণার শিকার হয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগরের জিইসি মোড় এলাকার এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘লোভনীয় অফার দেখে আমি এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করি। পরে লাভসহ আমার মূলধন তিন লাখ টাকায় দাঁড়ায়। কিন্তু টাকা তুলতে গেলে দেখি, আমাকে সব ধরনের যোগাযোগমাধ্যম থেকে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।’
এদিকে আগ্রাবাদ এলাকার আরেক ভুক্তভোগী জানান, আমি ঋণ নিয়ে দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলাম। প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছি। এখন ঋণের চাপে এলাকা ছাড়তে হয়েছে।’
কেন তারা থানায় অভিযোগ করেননি, জানতে চাইলে দুজনই বলেন, ‘লোকলজ্জা ও ঝামেলা এড়াতেই তারা আইনের আশ্রয় নেননি।’
এই বিষয়ে দারাজের সায়েম নামে এক প্রতিনিধি বলেন, ‘আমাদের নামে কেউ প্রতারণা করলে সেটি আমাদের দায় নয়। আমরা সব সময় গ্রাহকদের সতর্ক করে আসছি। দারাজ কখনো ব্যক্তিগতভাবে কারও কাছ থেকে টাকা বা ব্যক্তিগত তথ্য চায় না।’
পাঁচলাইশ থানার সেকেন্ড অফিসার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি প্রতারক চক্র বিভিন্ন নাম ও ভুয়া ওয়েবসাইট ব্যবহার করে মানুষকে বোকা বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে সচেতন রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষকে আরও সতর্ক হতে হবে।’