মেহেরপুরের প্রত্যন্ত করমদি গ্রাম। দিনের আলোয় স্বাভাবিক এক মাঠ, অথচ সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় তার চেহারা। গ্রামের মানুষ যাকে চেনে ‘জিনতলা' নামে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সাড়ে তিন শতবর্ষী রহস্যময় জোড়া তেঁতুল গাছ। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই গাছ দুটিই জিনদের আবাস। যুগের পর যুগ ধরে ভয়, মানত, বিশ্বাস আর অলৌকিক ঘটনার গল্পে ঘেরা এই স্থান।
মেহেরপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া ইউনিয়নের করমদি গ্রামে, গোসাইডুবি মাঠে অবস্থিত এই জোড়া তেঁতুল গাছ। গ্রামে শিশু থেকে বৃদ্ধ প্রায় সবাই একবাক্যে বলেন গাছ দুটিতে জিনের বসবাস। কেউ এই গাছের ডালপালা কাটলে বা বাড়িতে নিয়ে গেলে বিপদ অনিবার্য।
মানত, শিরনি আর ক্ষতির ভয়
গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, কেউ ভুলবশত গাছের ডাল কেটে ফেললে তাকে শিরনি দিয়ে মানত করতে হয়। কেউ কেউ মানত করেন মনের বাসনা পূরণ কিংবা শারীরিক সুস্থতার আশায়। আবার কেউ কেউ গাছের গায়ে লিখে রেখে গেছেন প্রিয় মানুষের নাম। এ যেন এক অদ্ভুত বিশ্বাসের নিদর্শন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল আকৃতির এই তেঁতুল গাছ দুটির ডালপালা চারদিকে ছড়িয়ে আছে। প্রতিটি গাছের কাণ্ডের ব্যাস আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ ফুট এবং উচ্চতা প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট। স্থানীয়দের অনেকেই দাবি করেন, মানতের পর পেয়েছেন সুফল। আবার কেউ সাহস করে ডাল কাটতে গিয়ে পড়েছেন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে।
সন্ধ্যার পর আতঙ্কের পথ
সন্ধ্যার পর এই জোড়া তেঁতুল গাছের পাশ দিয়ে হাঁটতে ভয় পান গ্রামবাসীরা। প্রবীণদের ভাষ্য, গভীর রাতে এখান দিয়ে চলার সময় শোনা যায় অদ্ভুত শব্দ। মাঝেমধ্যে রাতের আঁধারে মড়-মড় করে ডাল ভাঙার আওয়াজ পাওয়া যায়। কিন্তু, সকালে গিয়ে কোনো ভাঙা ডালের চিহ্ন মেলে না।
বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলতে আসা শিশু লিজন বলে, ‘আমরা এই গাছতলায় যাই না। সবাই বলে এখানে জ্বীন থাকে। ভয় লাগে।’
বংশপরম্পরায় শোনা গল্প
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আশরাফুল হুদা বলেন, 'আমরা বাপ-দাদার আমল থেকেই দেখে আসছি, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ মানত করতে আসে। কেউ ডাল কাটলে ক্ষতি হয়। তবে আমাদের বংশে জ্বীনের কারণে কারও ক্ষতি হয়নি। কিছুদিন আগে গ্রামের একজন ডাল কাটতে গিয়ে গাছেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে মানত ও শিরনির পর সুস্থ হয়।'
৭৫ বছর বয়সী আকিদুল ইসলাম বলেন, 'আমার বাবা ১১৫ বছর বয়সে মারা গেছেন। তিনিও গাছটাকে একই রকম দেখেছেন। আমার দাদাও এর বয়স বলতে পারেননি। জ্বীন আছে কি না জানি না, তবে ডাল কাটলে মানুষের ক্ষতি হয়, এটা সত্য।'
স্থানীয় কৃষক আব্দুল জলিলের ভাষায়, 'এই জায়গা ভয়ংকর। এখানে কেউ প্রসাব-পায়খানাও করে না। শুকনো ডাল পড়ে থাকলেও কেউ কুড়ায় না। এমনকি এই গাছের তেঁতুল পেড়ে বিক্রি করলেও বিপদ হয়, এমন গল্প সবাই জানে।'
ধর্মীয় ব্যাখ্যা
রহস্যের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা না মিললেও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন মেহেরপুরের মল্লিকপাড়া জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম মো. হাসানুজ্জামান। তিনি বলেন, 'ইসলামে জিনের অস্তিত্ব কোরআন দ্বারা প্রমাণিত। ২৬টি সুরায় জিন সম্পর্কিত আয়াত রয়েছে, আর সূরা জিন রয়েছে কোরআনের ২৯ পারায়। জিন ধোঁয়াহীন আগুন থেকে সৃষ্টি এবং বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করতে পারে। হাদিসে আছে, কেউ আয়াতুল কুরসি পাঠ করলে আল্লাহ তার জন্য প্রহরী নিযুক্ত করেন, তখন জিন কোনো ক্ষতি করতে পারে না।'
রহস্যই শেষ কথা
গাছ দুটির প্রকৃত বয়স বা এখানে সত্যিই জিনের বসবাস আছে কি না, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। তবে করমদি গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, ভয় আর গল্পের ভেতর দিয়েই প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে আছে এই জিনতলা। হয়তো এই রহস্যই জোড়া তেঁতুল গাছের সবচেয়ে বড় পরিচয়।