আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাগেরহাট জেলার চারটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন বাগেরহাট -২ (বাগেরহাট সদর-কচুয়া)-এ ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ এইচ সেলিম, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ জাকির হোসেন এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মঞ্জুরুল হক রাহাদকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নানা জল্পনা।
দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, অতীত অভিজ্ঞতা ও উন্নয়ন ভাবনাই এবারের নির্বাচনে ভোটের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় পরিচয়ের চেয়ে তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন সৎ নেতৃত্ব, এলাকার বাস্তব উন্নয়ন ও জনগণের পাশে থাকার মানসিকতাকে। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও ন্যায়বিচার এই বিষয়গুলোই ভোটারদের প্রধান চাওয়া।
বাগেরহাট শহরের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘কে এমপি হইবে সেটা বড় কথা না। যেই আসুক, আমরা চাই এলাকার উন্নয়ন। রাস্তা-ঘাট ভাঙাচুরা, একটু বৃষ্টি হলেই পানিতে ডুবে যায়। রোগী নিয়ে হাসপাতালে গেলে ঠিকমতো চিকিৎসা পাওয়া যায় না। এসব সমস্যার সমাধান চাই।’
অটোচালক হুমায়ুন বলেন, ‘নির্বাচন আসলেই সবাই কথা দেয়, কিন্তু পরে আর দেখা যায় না। আমাদের এলাকায় জলাবদ্ধতা খুব বড় সমস্যা। অল্প বৃষ্টিতেই ঘরবাড়িতে পানি উঠে যায়। হাসপাতাল আর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন খুব দরকার। যেই আসুক আমরা চাই সে যেন মানুষের কথা শোনে।’
বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ এইচ সেলিম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামায় নির্বাচনি সমীকরণে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার পর তিনি বলেন, বাগেরহাটের মানুষের ভালোবাসা ও অনুরোধেই তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
তিনি দাবি করেন, তার সংসদ সদস্য থাকাকালীন মুনিগঞ্জ সেতু, শহররক্ষা বাঁধ, মাজেদা বেগম কৃষি প্রযুক্তি কলেজ, বেলায়েত হোসেন ডিগ্রি কলেজসহ একাধিক বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে গত ১৭ বছরে বাগেরহাটে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে, শিক্ষিত ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ জাকির হোসেন। আইন পেশায় সুপরিচিত এই নেতা আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতির কথা বলছেন।
অনানুষ্ঠানিক প্রচারণায় তিনি বলছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, যুবসমাজের কর্মসংস্থান ও ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণই হবে তার অগ্রাধিকার। দেরিতে প্রার্থী ঘোষণা হলেও বর্তমানে তিনি ও তার নেতাকর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছেন।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মঞ্জুরুল হক রাহাদও ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। সংগঠিত কর্মীবাহিনী ও নিয়মিত মাঠপর্যায়ের প্রচারণার মাধ্যমে তিনি ভোটারদের কাছে পৌঁছাচ্ছেন।
তিনি নৈতিক রাজনীতি, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও সামাজিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক ও নিয়মিত ভোটব্যাংকের ওপর ভর করে জামায়াত এ আসনে ভালো ফলের আশা করছে।
উল্লেখ্য, বাগেরহাট-২ (বাগেরহাট সদর ও কচুয়া) আসনটি কোনো দলেরই একক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মীর সাখাওয়াত আলীকে পরাজিত করে বিজয়ী হন বিএনপির এ.এস.এম. মোস্তাফিজুর রহমান।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এ.এস.এম. মোস্তাফিজুর রহমানকে পরাজিত করে বিজয়ী হন মীর সাখাওয়াত আলী। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শেখ হেলাল উদ্দিনকে পরাজিত করে বিজয়ী হন বিএনপির এম.এ.এইচ. সেলিম।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির এম.এ. সালামকে পরাজিত করে এ আসন থেকে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের মীর শওকাত আলী। সর্বশেষ এ আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন শেখ সারহান নাসের তন্ময়। এবারের নির্বাচনের ফলাফলও তাই অনুমান করা কঠিন বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩৯ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৭০ হাজার ২৬৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৫ জন।