কক্সবাজারের রামু ও চকরিয়া উপজেলায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে তামাক চাষ। এক সময় যেখানে ধান, সবজি ও ডাল জাতীয় খাদ্যশস্যের চাষ হতো, সেই উর্বর জমিগুলো এখন দখল করে নিচ্ছে তামাক ক্ষেত। কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন— এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জেলার খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কক্সবাজার জেলায় প্রায় ৫৫০ হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে রামু ও চকরিয়ায় চাষের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। গত বছর এই দুই উপজেলাসহ জেলায় তামাক চাষ হয়েছিল প্রায় ৬৮০ হেক্টর জমিতে। যদিও এ বছর চাষের পরিমাণ কিছুটা কমেছে, তবুও ঝুঁকি রয়ে গেছে।
উর্বর জমিতে তামাক, কমছে খাদ্যশস্য
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, একবার তামাক চাষ শুরু হলে ওই জমিতে পরবর্তী সময়ে ধান, সবজি বা অন্যান্য ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। দীর্ঘমেয়াদে জমি অনাবাদি হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অধিক লাভের আশায় অনেক কৃষক তামাক চাষে ঝুঁকছেন। তবে এই লাভ স্বল্পমেয়াদি। তামাক চাষে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে দূষিত হচ্ছে আশপাশের জলাশয় ও নদী।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব
তামাক চাষ ও শুকানোর সময় নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া পরিবেশের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি। তামাক ক্ষেতে কাজ করা শ্রমিকদের মধ্যে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট ও চোখের জ্বালাপোড়ার মতো রোগ বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
রামুর বাসিন্দা মিরাজ আহমেদ বলেন, আগে আমাদের এলাকায় সহজেই শাকসবজি পাওয়া যেত। এখন চারদিকে শুধু তামাক ক্ষেত। কীটনাশকের গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, শিশুরা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে।
চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী এলাকার কৃষক মনির আহমেদ জানান, নদীর পাশেই তামাক চাষ হচ্ছে। বৃষ্টির সময় রাসায়নিক পানি নদীতে মিশে যায়। আগের মতো মাছ নেই, পানির মানও নষ্ট হয়ে গেছে।
লাভের ফাঁদে কৃষক
তামাক চাষি আহমেদ হোসেন বলেন, তামাক কোম্পানি বীজ, সার দেয়, আবার শেষে নগদ টাকা দেয়—এই জন্যই চাষ করছি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি জমির শক্তি কমে যাচ্ছে, অন্য ফসল ভালো হচ্ছে না।
রামুর গর্জনিয়ার কৃষক রমিজ উদ্দিন জানান, “এক মৌসুমে লাভ মনে হলেও চিকিৎসা খরচ আর জমির ক্ষতি মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিই হচ্ছে। কিন্তু বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় তামাক ছাড়তে পারছি না।
পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) কক্সবাজার শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন বলেন, তামাক চাষ শুধু কৃষির ক্ষতি নয়, এটি একটি বড় পরিবেশ বিপর্যয়। মাটি, পানি ও বায়ু—সবকিছুই দূষিত হচ্ছে। তামাক শুকাতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কাঠ ব্যবহারের কারণে বন উজাড়ের ঝুঁকিও বাড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, নদীপাড় ও জলাভূমি এলাকায় তামাক চাষ বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে পানিসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
চিকিৎসকদের সতর্কতা
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শান্তনু ঘোষ জানান, তামাক ক্ষেতে কাজ করা শ্রমিকদের মধ্যে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট ও চোখের জ্বালাপোড়ার রোগ বেড়েছে। শিশু ও নারীরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার হচ্ছেন। তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মাটির জৈব গুণাগুণ নষ্ট করছে এবং স্থানীয়ভাবে খাদ্যশস্য উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলেন, তামাক চাষ মাটির উর্বরতা নষ্ট করে এবং দীর্ঘমেয়াদে জমিকে অনাবাদি করে তোলে। আমরা কৃষকদের তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করে সবজি, ডাল ও অন্যান্য লাভজনক বিকল্প ফসলের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। তবে তামাক কোম্পানির আগাম অর্থ ও উপকরণের প্রলোভনে অনেক কৃষক ঝুঁকছেন।
তিনি আরও জানান, নদীপাড় ও জলাভূমি সংলগ্ন এলাকায় তামাক চাষ পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসব এলাকায় নজরদারি জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।”