রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে গুলিতে নিহত হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের (৫৭) অপরাধ জগতের হাতেখড়ি কোনো বড় মহানগরে নয়, বরং সীমান্ত শহর যশোরে। নব্বইয়ের দশকে যশোর শহর কাঁপানো এই সন্ত্রাসী যেভাবে দেশের ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় দুই নম্বরে উঠে এলেন, তা থ্রিলার সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
নিহত টিটনের পৈত্রিক নিবাস যশোর শহরের খড়কি এলাকায়। তার বাবা ফখরুদ্দিন ছিলেন খুলনার একটি জুটমিলের পদস্থ কর্মকর্তা। ১২ ভাই-বোনের মধ্যে টিটোন ও তার ভাই টুটুল খুব অল্প বয়সেই জড়িয়ে পড়েন অপরাধের অন্ধকারে। স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তারা যশোরে গড়ে তোলেন এক ত্রাসের রাজত্ব। চাঁদাবাজি, জমি দখল আর অস্ত্রের ব্যবসায় তাদের নাম তখন মানুষের মুখে মুখে।
টিটনের অপরাধ জীবনের বড় মোড় আসে ১৯৯৯ সালে। যশোরের কারবালা এলাকায় মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে বিএনপি কর্মী মোসলেম উদ্দিন খোকন ও টিপুকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করেন দুই ভাই টুটুল ও টিটোন। এই জোড়া খুনের পর এলাকায় তীব্র জনরোষের মুখে তারা যশোরে ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। ২০০০ সালে ভাই টুটুল র্যাবের কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হলে টিটোন পুরোপুরি আন্ডারওয়ার্ল্ডে গা ঢাকা দেন।
ঢাকায় এসে টিটনের পরিচয় বদলে যায় তার ভগ্নিপতি, কুখ্যাত শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের মাধ্যমে। ইমনের অপরাধ সাম্রাজ্যের ‘প্রধান সেনাপতি’ বা সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব নেন টিটন। ২০০১ সালে তৎকালীন সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ইমনের সঙ্গে টিটনের নামও যুক্ত হয় দুই নম্বরে। ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি বাড়ি গড়ে তুলে সেখান থেকেই দেশব্যাপী নিজের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি।
স্থানীয় সূত্র বলছে, টিটন যশোর-ঢাকা রুটে একটি শক্তিশালী অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ অস্ত্র যশোরে মজুত করে পরে তা পৌঁছে দেওয়া হতো ঢাকার বড় বড় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে। টিটনের এই সিন্ডিকেট দেশের অন্যতম প্রধান অবৈধ অস্ত্রের জোগানদাতা হিসেবে পরিচিত ছিল।
পেশাদার এই সন্ত্রাসী তার জীবনে বহুবার পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন। প্রায় দুই দশক কারাবাসের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ১২ আগস্ট জামিনে মুক্ত হন তিনি। কারাগার থেকে বেরিয়ে আবারও নিজের হারানো আধিপত্য পুনরুদ্ধারে সক্রিয় হয়েছিলেন টিটন। কিন্তু সেই সক্রিয়তাই শেষ পর্যন্ত তার প্রাণ কেড়ে নিল।