রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ আর এলাকাভিত্তিক আধিপত্যের লড়াইয়ে একের পর এক খুনোখুনি হচ্ছে, ঝরছে প্রাণ। গত বছরের নভেম্বরে রায়সাহেব বাজার এলাকায় তারিক সাঈদ মামুন খুন হওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই নিউমার্কেট কাঁচাবাজারে টিটনের হত্যাকাণ্ড নতুন করে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য এবং অপরাধ জগতের গতিবিধি বিশ্লেষণ করলে এই দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে এক গভীর ও রহস্যময় যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র অধিপতি হওয়ার পথে কাঁটা সরাতেই কি এসব খুন? গোয়েন্দাদের তন্দন্ত এখন সেই প্রশ্নেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নিহত তারিক সাঈদ মামুন ছিলেন ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের বাল্যবন্ধু। এক সময় তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজধানীর একাংশের অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করতেন। কিন্তু ক্ষমতার মোহ আর অর্থের ভাগবাটোয়ারা সেই দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বে ফাটল ধরায়। গত বছরের নভেম্বরে নিম্ন আদালত এলাকায় যখন মামুনকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়, তখনই আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্যের লড়াই প্রকাশ্যে চলে আসে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তৎপর হয়ে উঠে বিষয়টি নিয়ে।
মামুন খুনের পর ঢাকার একাংশের অপরাধী চক্রের সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করে। মামুনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত টিটন ও হেলাল একজোট হয়ে বাংলামোটর, এলিফ্যান্ট রোড ও মগবাজার এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জোর তৎপরতা শুরু করেন। এই নতুন জোটটি সরাসরি ইমনের সাম্রাজ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, যা ইমনের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইকে অনিবার্য করে তোলে। ইমন ও তার দলবল শক্তি জড়ো করতে থাকেন অস্তিত্ব রক্ষায়।
একাধিক সূত্র জানায়, নিউমার্কেট কাঁচাবাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইমন ও টিটনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত চলছিল। ওই বাজারের ফুটপাত থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ দোকানপাট থেকে চাঁদা তোলার বিশাল অংকের টাকা ছিল এই দ্বন্দ্বের মূলে। সাম্প্রতিক সময়ে ইমনের প্রভাব খর্ব করে টিটন সরাসরি বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন।
মূলত এই বাজার দখলের লড়াই এবং মামুন হত্যার পর ইমনের বিরুদ্ধে নতুন করে জোট গঠনই টিটনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। নিউমার্কেট কাঁচাবাজারের বটতলা এলাকায় সেই রেষারেষিরই চূড়ান্ত রূপ ঘটে, যেখানে প্রতিপক্ষের গুলিতে প্রাণ হারান টিটন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, যা কোনো পেশাদার ঘাতক চক্রের কাজ বলে মনে করা হচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মামুন এবং টিটন দুজনকেই সরিয়ে দেওয়ার নেপথ্য কারিগর একই হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মামুন হত্যার মাধ্যমে যেমন মগবাজার-এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তেমনি টিটন হত্যার মাধ্যমেও নিউমার্কেট এলাকার হারানো আধিপত্য ফিরে পাওয়ার ছক কষা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিহত মামুন ও টিটন দুজনই এক সময় ইমনের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। কিন্তু আন্ডারওয়ার্ল্ডের অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী, যখনই কেউ শীর্ষ নেতৃত্বের একচ্ছত্র আধিপত্যে ভাগ বসাতে চেয়েছে, তখনই তার ওপর নেমে এসেছে খুনের খড়গ।
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ইমন বর্তমানে আত্মগোপনে থাকলেও তার অনুসারীদের মাধ্যমে রাজধানীর অপরাধ জগতের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, টিটন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে মামুন খুনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুটি ঘটনার ধরন, সময় এবং সম্ভাব্য মোটিভের মধ্যে গভীর মিল খুঁজে পাচ্ছেন গোয়েন্দারা। ইতোমধ্যেই ইমনের অবস্থান এবং তার সহযোগীদের কার্যক্রম নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই রেষারেষি কেবল ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়, বরং এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার একটি বৃহৎ নীল নকশার অংশ। এই জোড়া খুনের রহস্য উদঘাটন করতে পারলে রাজধানীর অপরাধ জগতের অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে।
মামুন ও টিটন হত্যাকাণ্ডের পর ধানমন্ডি, নিউমার্কেট এবং মগবাজার এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই রক্তক্ষয়ী লড়াই থামবে কি না, না কি এর রেশ ধরে আরও প্রাণহানি ঘটবে, সেই শঙ্কাই এখন জনমনে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, খুনিদের শনাক্ত করার পাশাপাশি এই অস্থিরতা বন্ধে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।