অনলাইন জুয়ার আড়ালে ডিজিটাল হুন্ডি
বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ কিছু মোবাইল ফোন আর সিম কার্ড, কিন্তু এর আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক বিশাল অন্ধকার জগৎ, যেখানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে এবং নিমিষেই সেই টাকা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। অনলাইন জুয়ার ফাঁদ পেতে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চক্রগুলো কীভাবে দেশের অর্থনীতিকে ফোকলা করছে, তার এক ভয়ঙ্কর চিত্র উন্মোচন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সম্প্রতি সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে এই চক্রের মূলহোতাসহ ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—আশরাফ উদ্দীন আহম্মেদ, সজীব চক্রবর্তী, আশরাফুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, তৈয়ব খান, সৌমিক সাহা, কামরুজ্জামান ও আব্দুর রহমান। এই চক্রের নেটওয়ার্ক ভাঙতে গিয়ে উঠে এসেছে ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহারের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সিআইডির সাইবার মনিটরিং ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এই চক্রটি গত প্রায় ছয় মাস ধরে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা অবৈধভাবে লেনদেন করছিল।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, চক্রটি মূলত তিনটি স্তরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতো, সাধারণ মানুষকে দ্রুত ধনী হওয়ার লোভ দেখিয়ে এবং নানামুখী কৌশল ব্যবহার করে অনলাইন জুয়ার প্রতি আকৃষ্ট করা হতো। এরপর জুয়াড়িদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা হতো বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। সংগৃহীত এই বিপুল পরিমাণ টাকা দেশে রাখা হতো না। সিআইডি জানিয়েছে, টাকাগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সি (যেমন বিটকয়েন বা ইউএসডিটি) এবং ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে বিদেশে পাচার করে দেওয়া হতো।
ডিজিটাল দুনিয়ায় এই চক্রটির ওপর দীর্ঘদিন ধরে নজর রাখছিল সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স টিম। সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ শনাক্তের পর পল্টন মডেল থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ধারায় একটি মামলা করা হয়।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জে অভিযান চালিয়ে চক্রের চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং অনলাইন ডেটা বিশ্লেষণ করে নরসিংদীর পলাশ ও ঢাকার ধানমন্ডি থেকে আরও চারজনকে আটক করা হয়। অভিযানকালে তাদের কাছ থেকে ১৩টি মোবাইল ফোন, ২০টি সিম কার্ড (যার মধ্যে দুটি বিকাশ এজেন্ট সিম রয়েছে) এবং ভুয়া নামে এজেন্ট সিম পাঠানোর কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের রশিদ জব্দ করা হয়।
অনলাইন জুয়ার এই মরণকামড় রুখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন অল-আউট আক্রমণে। সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিট জানিয়েছে, শুধু চলতি মে মাসের ১ তারিখ থেকে এ পর্যন্ত ১১৬টি অবৈধ জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধের জন্য বিটিআরসিতে তালিকা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি, এই অবৈধ অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে ৮৭৯টি সন্দেহভাজন এমএফএস অ্যাকাউন্ট এবং ৪৩টি ব্যাংক হিসাবের তালিকা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) পাঠানো হয়েছে ফ্রিজ বা স্থগিত করার জন্য।
গ্রেপ্তারকৃতরা ইতোমধ্যে ডিজিটাল হুন্ডি এবং অনলাইন গ্যাম্বলিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাচারের কথা স্বীকার করেছে। তবে সিআইডির কাজ এখানেই শেষ হচ্ছে না। সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, পাচার হয়ে যাওয়া কোটি কোটি টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো ওয়ালেটগুলো শনাক্ত করতে তারা এখন ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে।
সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চক্রটি কেবল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এমন আরও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলতে না পারলে দেশের অর্থনীতিতে এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করা কঠিন হবে।