সিআইডির জালে ক্রিপ্টোকারেন্সির ৩ মাস্টারমাইন্ড
আইপিএল, বিপিএল কিংবা আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ—টেলিভিশনের পর্দায় যখন বল গড়ায়, তখন কোটি ভক্তের চোখে থাকে উত্তেজনা। কিন্তু মাঠের এই উন্মাদনাকে পুঁজি করে পর্দার আড়ালে বসে অন্য এক ভয়ঙ্কর ‘ব্লুপ্রিন্ট’ সাজাচ্ছে আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্র। মোবাইল স্ক্রিনের এক ক্লিকে যুবসমাজকে অনলাইন জুয়ার মরণফাঁদে ফেলে দেশ থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এই অবৈধ ডিজিটাল সাম্রাজ্য চালানো এক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের তিন শীর্ষ সদস্যকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকায় সাড়াঁশি অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস শাখার একটি দল।
সিআইডির সাইবার মনিটরিং সেল দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে নজরদারি চালিয়ে দেখতে পায়, কিছু সুসংগঠিত চক্র আন্তর্জাতিক ও দেশীয় জুয়ার সাইটগুলো বাংলাদেশে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে পরিচালনা করছে। এরই প্রেক্ষিতে পল্টন মডেল থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারায় মামলা হয়।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন গোপন আস্তানায় ঝটিকা অভিযান চালায় সিআইডি। গ্রেপ্তার করা হয় চক্রের তিন মূলহোতাকে—ফটিকছড়ির আলা উদ্দিন, মীরসরাইর শাহাদাৎ হোসেন ও নীলফামারীর সৈয়দপুরের সাহাব উদ্দিনকে। এ সময় তাদের কাছ থেকে পাঁচটি বিশেষ মোবাইল ফোন, বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম কার্ড ও চেকবই উদ্ধার করা হয়, যা দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হতো।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুক ও টেলিগ্রামে আকর্ষণীয় স্পনসরড বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রথমে তরুণ ও সাধারণ জুয়াড়িদের আকর্ষণ করা হতো।
জুয়ার সাইটগুলোতে অংশগ্রহণের জন্য ব্যবহারকারীদের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, যেমন বিকাশ, রকেট, নগদ কিংবা সরাসরি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা জমা দিতে হতো। টাকা জমা হওয়া মাত্রই ডিজিটাল কারসাজির মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্টে যুক্ত করা হতো ই-মানি বা ‘বট মানি’। এই ছদ্মবেশী বট মানি দিয়েই চলতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও ফুটবলের ম্যাচ ফিক্সিং ও বাজি ধরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এই চক্রটি প্রতিনিয়ত তাদের এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব পরিবর্তন করত। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোটা অংকের কমিশনের লোভে স্থানীয় এজেন্ট নিয়োগ করা হতো।
এই স্থানীয় এজেন্টদের সংগৃহীত পার্সোনাল ও মার্চেন্ট নম্বরগুলো পরবর্তীতে অত্যন্ত সুরক্ষিত ও এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ‘টেলিগ্রাম’ ব্যবহার করে বিদেশে অবস্থানকারী মূল গডফাদারদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। ফলে মাঠপর্যায়ে কোনো নম্বর ট্র্যাকিংয়ে আসলেও মূল অপরাধীরা থেকে যেত ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অনলাইন জুয়ার ভয়ঙ্কর বিস্তার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছরের ২৮ মে একটি জরুরি পিএসডি সার্কুলার জারি করেছিল। যেখানে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল অনলাইন গ্যাম্বলিং ও বেটিংয়ের সমস্ত আর্থিক পথ বন্ধ করার। কিন্তু সিআইডির তদন্তে দেখা গেছে, এই চক্রটি রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধ ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে সংগৃহীত কোটি কোটি টাকা ব্যাংক হিসাব থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চুয়াল মুদ্রা বিটকয়েন বা ইউএসডিটিতে রূপান্তর করে মুহূর্তের মধ্যে বিদেশে পাচার করে দিচ্ছিল।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত আলা উদ্দিন, শাহাদাৎ ও সাহাব উদ্দিন অনলাইন বেটিং ও অবৈধ অর্থ পাচার চক্রের সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে।
সাইবার পুলিশ সেন্টা (সিপিসি) জানিয়েছে, এই দেশবিরোধী চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও অপরাধের তথ্য উদঘাটনে সিআইডির বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে।