বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালেও সামনে বড় বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। রাজধানীতে বুধবার (২৮ জানুয়ারি) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পরবর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনার ও ‘ইআরএফ শিক্ষাবৃত্তি-২০২৬ প্রদান’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বিগত সরকারের সময় আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। পাচার ও অব্যবস্থাপনার ফলে ব্যাংক খাতের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। তবে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে।
তিনি আরও বলেন, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে এবং বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। রিজার্ভও ধীরে ধীরে বাড়ছে। এ ছাড়া জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের কাছাকাছি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, গভর্নর চেয়েছিলেন মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমাতে, কিন্তু এটি ধীরগতিতে কমবে। পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে এটি ১১ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ অবস্থায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের স্বার্থে দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত।
জ্বালানি খাতকে ভবিষ্যতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতে সম্ভাবনা থাকলেও পরিকল্পনাহীনতার কারণে অতীতে কিছু প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি জানান, সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করেছে, যার ফলে বেসরকারি খাতে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
দুর্নীতি রোধে বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সরকারি ক্রয়নীতি সংশোধন করে এখন সব সরকারি টেন্ডার শতভাগ অনলাইনে হচ্ছে। যার ফলে প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কমছে।
বাজেট পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির তুলনায় এখনো খুবই কম। রাজস্ব আয় দিয়ে মূলত পরিচালন ব্যয় মেটানো হচ্ছে। আর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন ব্যয় করা হচ্ছে ঋণের ওপর নির্ভর করে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।
উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেন, অর্থ পাচার ও ব্যাংক খাতের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করতে দীর্ঘ সময় লাগবে। বৈদেশিক ঋণ নিয়ে সামাজিক খাত উন্নয়নের ধারা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অহেতুক বিদেশি পরামর্শক নির্ভর প্রকল্প বাতিল করা হচ্ছে।
শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া শুধু অবকাঠামো নির্মাণ টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। ভৌত অবকাঠামো দিয়ে কঙ্কাল তৈরি করা যায়, কিন্তু মানবসম্পদ ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি আরও জানান, বছরের পর বছর শিক্ষার মান নিম্নমুখী হওয়ায় প্রশাসনের দক্ষতা কমেছে। বর্তমান যুব সমাজের নিরাশা দূর করতে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগাতে কারিগরি ও মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে কাজ করছে, যার ফলাফল ভবিষ্যতে আরও স্পষ্ট হবে।