বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, সমন্বয়হীনতা ও যোগ্য ব্যক্তির অভাবে ঝুলে আছে দেশের একমাত্র বিশেষায়িত টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের অটোমেশন প্রকল্পের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন। ফলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ প্রকল্প বাস্তবায়নে নিযুক্ত ভেন্ডর কোম্পানির। গত ২১ ডিসেম্বর এই প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি, প্রকল্পে নিযুক্ত ভেন্ডর কোম্পানি ও বিশ্ববিদ্যালয়টির একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে ফ্রেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এ টি এম ফয়েজ আহমেদ প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ এই প্রকল্প বাস্তবায়নে নিযুক্তরা প্রকল্পের দায় এড়িয়ে চলতে চায়, সে কারণে একটি তৃতীয় পক্ষ প্রয়োজন, যাতে করে, কে কি করছে তার মূল্যায়ন করা যায়।
এদিকে অটোমেশন কার্যক্রম বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজোশ রয়েছে বলেও জানা গেছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে নিযুক্ত টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য সচিব, আইসিটি সেলের ইনচার্জ আসিফুর রহমানের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে সময় না দিয়ে মুখের ওপর দড়জা বন্ধ করে দেন এবং এক ঘণ্টা পর যোগাযোগ করতে বলেন। এক ঘণ্টা পর তার সঙ্গে আবারও দেখা করার চেষ্টা করা হলে তিনি তার কক্ষে তালা দিয়ে চলে যান এবং পরে তাকে আর পাওয়া যায়নি।
তবে অটোমেশন কার্যক্রমের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। অটোমেশন কার্যক্রম শুরু হলে অ্যাডমিশন ফি, সেশন ফি, ফরম পূরণের ফি জমা দেওয়াসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে তাদের ব্যাপক সুবিধা হবে বলে জানিয়েছেন একাধিক শিক্ষার্থী। তারা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর চলে গেছে। কিন্তু এখানে অটোমেশন প্রক্রিয়াটা এখনো তেমনভাবে চালু হয়নি। বর্তমান সময়ে অটোমেশন প্রক্রিয়াটা অত্যন্ত জরুরি। সব কিছু ডিজিটালাইজেশন হয়েছে। অটোমেশন প্রক্রিয়াটা ঠিকভাবে চালু হলে তাদের বিভিন্ন সুবিধা হবে বলেও জানান তারা।
অন্যদিকে শিক্ষকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতার কারণেই ঝুলে আছে অটোমেশন কার্যক্রম। শিগগিরই আবার এ কার্যক্রম শুরু হবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেব্রিক ইঞ্জনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. এমদাদ সরকার বলেন, ‘অটোমেশনের কাজটা আমি যতদূর জানি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এখানে একাডেমিক, অ্যাকাউন্টস, এক্সামিনেশনসহ অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। কাজটা চলমান আছে, তবে কাজটা খুব ধীর গতিতে এগুচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় যারা কাজটা করছেন, তাদের ভেতরে হয়তো সমন্বয়হীনতার অভাব আছে। ফাইনালি আমরা কাজটা বুঝে পাচ্ছি না।’
প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীর গতির কারণ জানাতে দীর্ঘ গল্প জানালেন প্রকল্পটির পরিচালক ড. হোসনে আরা বেগম। বিশ্ববিদ্যালয়ে এই কার্যক্রম পরিচালনার মতো যোগ্য ব্যক্তি নেই বলেও জানান তিনি। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এই প্রকল্পের কাজ চালু হবে।
এ বিষয়ে নেটওয়ার্ক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ল্যাব উন্নয়ন প্রকল্পের (আইইউএমএস) প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, ‘শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে জুন মাসে পুরো কর্মবিরতি ছিল। তখন কাজটি করা যায়নি। পরবর্তীতে জুলাই-আগস্ট মাসে গণ-অভ্যুত্থান। তার পর পরই শুরু হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন। তখন এ কাজটি ঝুলে গেছে।’
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জানালেন দেড় বছর আগেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও এর কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। নিজে কোনো দায়-দায়িত্ব না নিয়ে প্রকল্প পরিচালকের ওপর সব দায় চাপিয়ে দেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইঞ্জিনিয়ার মো. জুলহাস উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘পিসিআর (প্রজেক্ট কম্লিশেন রিপোর্ট) এখনো হয় নাই। আমরা ম্যাডামকে চিঠি দিয়েছি, মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি থেকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি এ মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত সময় নিয়েছেন।’
এর আগে গত ২১ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য জানিয়েছিলেন, চলতি মাসের ৩০ তারিখের মধ্যেই পিসিআর দেওয়ার কথা। কিন্তু সে কথা কেবল কথাতেই রয়ে গেছে। আজ অবধিও অলোর মুখ দেখেনি পিসিআর।
এদিকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়ে নির্ধারিত জুন মাসেই শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে কাজটির ভেন্ডর কোম্পানি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ কাজটি বুঝে না নেওয়ার কারণেই ঝুলে আছে বুটেক্সের অটোমেশন প্রকল্প।