আজ ২১ ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দিবসটি ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের আদিবাসী শিক্ষার্থীরা নিজেদের মাতৃভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও পরিচয় নিয়ে তুলে ধরেছেন গভীর ভাবনা। তাদের কথায় উঠে এসেছে শেকড় হারানোর শঙ্কা, আবার ভাষা বাঁচিয়ে রাখার দৃঢ় অঙ্গীকারও।
‘মায়ের মুখের রূপকথাই আমার মাতৃভাষা’
ফিন্যান্স বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী উষাং চাক বলেন, মাতৃভাষা তার কাছে কেবল ব্যাকরণ নয়; এটি মায়ের মুখে শোনা ‘আউক পদুংমাং’ কিংবা ‘অজগর রাজা’র মতো রূপকথার গল্প। ছোটবেলায় ঘুমানোর আগে মা যে গল্প শোনাতেন, সেখানে ছিল অভাবী এক মায়ের সংগ্রাম, সন্তানের প্রতি মমতা আর জীবনের গভীর শিক্ষা।
তিনি বলেন, ‘আজ আমি বড় হয়েছি, গল্পের অর্থ বুঝি। কিন্তু, আমি কি আমার পরবর্তী প্রজন্মকে চাক ভাষায় সেই গল্প শোনাতে পারব? শহরে এসে টিকে থাকার লড়াইয়ে আমাদের ভাষাটা যেন ব্যাগের এক কোণায় পড়ে থাকে।’
তার মতে, উচ্চশিক্ষার পথে এগোলেও মাতৃভাষা চর্চার পরিবেশ না থাকায় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অনেক শিক্ষার্থী নিজ সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তাই তাদের দাবি শিক্ষার মূলস্রোতে নিজ নিজ ভাষার চর্চা ও সংরক্ষণের উদ্যোগ।
‘অন্যের মাতৃভাষা নিয়ে কটাক্ষ বন্ধ হোক’
একই বর্ষের শিক্ষার্থী উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি শুধু একটি দিবস নয়, এটি আত্মত্যাগের গৌরবময় ইতিহাস। ১৯৫২ সালে ভাষার অধিকারের জন্য বরকত, সালামদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এখনো অনেক ক্ষেত্রে অন্যের মাতৃভাষা নিয়ে হাসি-তামাশা বা কটাক্ষ করা হয়। বাংলাদেশে বাংলা ছাড়াও প্রায় চল্লিশের বেশি ভাষা প্রচলিত। এসব ভাষাভাষী শিক্ষার্থীরা অনেক সময় স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ ভাষার কারণে বিদ্রূপের শিকার হন।
তার দাবি, সব মাতৃভাষার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এবং সাংবিধানিক ও শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ভাষাগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয়।
‘মারমা ভাষা একটি জাতির আত্মার ভাষা’
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী পাইখিনুং মাথিং মারমা বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। তিনি জানান, বাংলা ভাষা যেমন রাষ্ট্রভাষা ও সংগ্রামের ভাষা, তেমনি মারমা ভাষাও একটি প্রাচীন ও প্রাণবন্ত ভাষা। এর ভেতর লুকিয়ে আছে পাহাড়ের প্রকৃতি, জীবনদর্শন, লোকগান ও প্রজন্মের স্মৃতি। তার ভাষায়, একটি ভাষা হারিয়ে গেলে শুধু শব্দ নয় হারিয়ে যায় একটি ইতিহাস ও অস্তিত্ব।
তিনি উল্লেখ করেন, এই দিবসটি ইউনেস্কো এর উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়, যার মূল বার্তা ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সহনশীলতা। মারমা শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, ডিজিটাল মাধ্যমে ভাষার কনটেন্ট তৈরি এবং গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
হাজং ভাষা রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান
ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি শুধু শোকের নয়, ভাষার অধিকার রক্ষার অঙ্গীকারের দিন। হাজং ভাষা হাজং জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মূলভিত্তি।
তিনি বলেন, ভাষার মধ্যে লুকিয়ে থাকে ইতিহাস, লোককথা, গান ও আচার-অনুষ্ঠান। আধুনিক শিক্ষা ও নগরায়নের প্রভাবে তরুণ প্রজন্ম মাতৃভাষার ব্যবহার কমাচ্ছে। তাই হাজং ভাষায় বই, গল্প, গান ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির উদ্যোগ নিতে হবেG
পরিবার ও সমাজে নিয়মিত ভাষা চর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও গবেষণার মাধ্যমে ভাষা সংরক্ষণ সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।