বাঙালির ঈদ মানেই রেডিও-টেলিভিশন আর পাড়ার অলিতে-গলিতে বেজে ওঠা সেই চিরচেনা সুর—‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। প্রায় এক শতাব্দী ধরে ঈদের আগমনী গানটি ছাড়া বাঙালির ঈদ উদযাপন যেন অপূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু পাঠকদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল কালজয়ী এই গানটি? এর নেপথ্যে রয়েছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং লোকসঙ্গীত সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদের এক অনন্য মেলবন্ধন।
এক অনুরোধ আর আধঘণ্টার জাদু
ইতিহাসের পাতা ও আব্বাসউদ্দীন আহমদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ১৯৩১ সালের (১৩৩৮ বঙ্গাব্দ) এক পড়ন্ত বিকেলে গ্রামোফোন কোম্পানি ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’-এর অফিসে বসেছিল গানের আড্ডা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কবি নজরুল। শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ কবির কাছে একটি বিশেষ অনুরোধ নিয়ে যান। সে সময় বাংলা ভাষায় ইসলামী গান বা নাতে-রাসূলের তেমন প্রচলন ছিল না। তখন ছিল উর্দু আর হিন্দি গানের দাপট।
আব্বাসউদ্দীন কবিকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘কাজী দা, পীর-পয়গম্বরদের নিয়ে তো অনেক গান আছে, কিন্তু আমাদের মুসলমানদের জন্য কেন একটি সুন্দর ঈদের গান নেই?’ কবির মনে এই অনুরোধ তীরের মতো বিঁধেছিল। তিনি তৎক্ষণাৎ কাগজ-কলম হাতে তুলে নেন। চা পান করতে করতে মাত্র আধঘণ্টারও কম সময়ে তিনি রচনা করে ফেলেন এই অমর কাব্য।
রেকর্ডিং ও প্রথম কণ্ঠের জাদু
গানটি লেখার পর নজরুল নিজেই সুরারোপ করেন এবং আব্বাসউদ্দীনকে গেয়ে শোনান। কবির নির্দেশে গ্রামোফোন কোম্পানির ট্রেইনারকে ডেকে দ্রুত সুর চূড়ান্ত করা হয়। ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আব্বাসউদ্দীন আহমদের দরদি কণ্ঠেই গানটি প্রথম রেকর্ড করা হয় (রেকর্ড নম্বর: এন-৪১১১)।
রেকর্ডটি বাজারে আসার সাথে সাথে অভাবনীয় সাড়া ফেলে চারদিকে। আব্বাসউদ্দীন আহমদ তার স্মৃতিকথায় গর্বের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, নজরুলের এই সৃষ্টি ছিল বাংলা সাহিত্যে ইসলামী রেনেসাঁ বা জাগরণের এক নতুন এক দিগন্ত। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং আব্বাসউদ্দীনের দরাজ কণ্ঠের এই যুগলবন্দি আজ প্রায় শত বছর ধরে প্রতিটি ঈদের সকালে বাঙালির হৃদয়ে আনন্দের ঢেউ তুলে যাচ্ছে। সামনে আরো হাজার বছরও এই গানের প্রাসঙ্গিকতা রয়ে যাবে।
গানটি কেবল একটি ধর্মীয় সঙ্গীত নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার হলেও এই গানের আবেদন আজও অমলিন, যা প্রমাণ করে কালজয়ী সৃষ্টির কোনো মৃত্যু নেই।