চলচ্চিত্র দুনিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ‘কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এর এবারের ৭৯তম আসরটি (২০২৬) তার প্রথাগত রূপের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন আবহে মুখরিত। অতীতে কানের লাল গালিচা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের স্পটলাইট যেভাবে হলিউডের বিশাল বাজেটের ব্লকবাস্টার সিনেমাগুলো দখল করে রাখত, এবার সেখানে মার্কিন স্টুডিওগুলোর উপস্থিতি বেশ নিয়ন্ত্রিত ও ম্লান।
তবে হলিউডের এই জৌলুস কমলেও উৎসবের বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সিনেমা, স্বাধীন ঘরানার এশীয় নির্মাতাদের উপস্থিতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে নীতিনির্ধারণী নতুন বিতর্ক এবং শর্ট ফিল্ম কর্নারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ঐতিহাসিক পদচারণা।
এবারের উৎসবের সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নুড়ি’। মিথুন জামান রচিত ও পরিচালিত ১৬ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্রটি কান উৎসবের শর্ট ফিল্ম কর্নারের 'আগামীর সিনেমা' (সিনেমা অব টুমরো) বিভাগের অফিশিয়াল মার্কেট ক্যাটালগে স্থান পেয়েছে। ১৭ মে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী ‘এসএফসি রঁদেভু-ইন্ডাস্ট্রি’র বিশেষ এই আয়োজনে অংশ নিতে বর্তমানে ফ্রান্সে অবস্থান করছেন ছবির নির্মাতা মিথুন জামান এবং প্রযোজক হাসিব জুবেরী শিহান।
কক্সবাজারের পটভূমিতে নির্মিত এই সিনেমাটিতে একটি সদ্যজাত ঘোড়ার বাচ্চার সঙ্গে ১১ বছর বয়সী এক স্থানীয় কিশোরীর অপ্রত্যাশিত মানসিক বন্ধন, জীবনের লড়াই এবং আশার গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা কানের বিশ্বব্যাপী পরিবেশক, প্রযোজক ও উৎসব প্রতিনিধিদের প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। টিম প্ল্যাটফর্ম লিমিটেড প্রযোজিত এই সিনেমাটি বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে এক গভীর মানবিক বার্তা বহন করছে।
বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের এই গৌরবের সমান্তরালে মূল উৎসবের নীতিনির্ধারণী ফোরামগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এবারের কানের সমান্তরাল বিভিন্ন প্যানেল আলোচনা এবং 'কান মার্কেট'-এ এআই (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিশ্ব চলচ্চিত্রের শীর্ষ ব্যক্তিরা বিতর্কে জড়িয়েছেন। চিত্রনাট্য তৈরি, নিখুঁত ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস এবং সিনেমার পোস্ট-প্রোডাকশনের খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনতে এআই-এর ইতিবাচক ভূমিকার কথা যেমন উঠে আসছে, তেমনি চিত্রনাট্যকার ও কলাকুশলীদের মেধার অধিকার রক্ষা এবং আইনি ঝুঁকি নিয়ে সরব হয়েছেন বোদ্ধারা। হলিউডে গত বছরের লেখক ও অভিনয়শিল্পীদের ধর্মঘটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কারণে এবার ব্লকবাস্টার কমে গেলেও, কানের এই প্রযুক্তি-বিতর্ক ভবিষ্যতের সিনেমার নতুন রূপরেখা তৈরি করছে।
হলিউড স্টুডিওগুলোর অনুপস্থিতি কানের বৈচিত্র্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যার পুরো সুবিধা পাচ্ছে এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার স্বাধীন ঘরানার চলচ্চিত্রগুলো। পারিবারিক মনস্তত্ত্ব, ভূ-রাজনীতি এবং চলমান অভিবাসন সংকট নিয়ে তৈরি দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ভারতের ভিন্নধর্মী গল্পের সিনেমাগুলো জুরি বোর্ড ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়াচ্ছে। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, কান ২০২৬ কেবল তারকাদের জৌলুস আর লাল গালিচার চেনা বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই; বরং 'নুড়ি'র মতো বিশ্বমানের স্বাধীন কাজকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরা এবং প্রযুক্তির নতুন চ্যালেঞ্জকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে এই আসর চলচ্চিত্র ইতিহাসের এক নতুন মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে।