ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছেন, টিকা সংকট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে বারবার চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল এবং ২০২৪ সাল থেকে অন্তত ১০টি মিটিংয়ে সরকারের কর্মকর্তাদের এটি বলা হয়েছিল।
ইউনিসেফ কার্যালয়ে বুধবার (২০ মে) দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনায় দেশে সময়মতো টিকা আসেনি। পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি সরকারের স্বাস্থ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—উভয়কেই এই পরিস্থিতির বিষয়ে আগেই অবহিত করা হয়েছিল।
‘হামের প্রাদুর্ভাব ও চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলা কার্যক্রম’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, চলতি বছরের মে মাস থেকে দেশে পুনরায় হামের রুটিন টিকা আসতে শুরু করেছে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে।
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘দেশে টিকার মজুত নিশ্চিত থাকা জরুরি। উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহ করতে এক বছরের মতো সময় লেগে যায়। ইউনিসেফের মাধ্যমে দ্রুত টিকা সংগ্রহ করা যায়।’
টিকা সংকটের পেছনে অর্থের কোনো অভাব ছিল না বলেও জানিয়েছে ইউনিসেফ। মূল সমস্যাটি ছিল ক্রয় প্রক্রিয়ার ধরন নিয়ে। ব্যাখ্যা করে প্রতিনিধি বলেন, ‘’টিকা কোনো সাধারণ পণ্য নয় যে সস্তা দরে বাজার থেকে কেনা যাবে। এটি অত্যন্ত বিশেষায়িত পণ্য, যার মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) দ্বারা অনুমোদিত হতে হয়। ইউনিসেফ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের পক্ষ থেকে সস্তায় ও মানসম্মত টিকা সংগ্রহ করে। কিন্তু উন্মুক্ত দরপত্রের নিয়ম অনুসরণ করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ হয়েছে, যা রুটিন টিকাদানকে বাধাগ্রস্ত করেছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণ ছিল উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার বিষয়ে (অন্তর্বর্তী সরকারের) মন্ত্রিসভার একটি সিদ্ধান্ত।’
গত বছর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় না এ ধরনের সিদ্ধান্ত এর আগে কখনো নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়টি আপনারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যাচাই করে নিতে পারেন।’
অন্যদিকে এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান দাবি করেন, ইউনিসেফ হামের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে তৎকালীন সরকারকে সতর্ক করেনি। এ বিষয়ে ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা বলেন, ‘‘এ মুহূর্তে আমার হাতের কাছে একেবারে সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখ নেই। তবে তদন্তে বিষয়টি নিশ্চিত হবে। আমি এটুকু জানি, আমরা ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ-ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছি, যার মধ্যে শেষ চিঠিটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগে পৌঁছেছিল। আমরা আশা করেছিলাম, যিনি নতুন করে এই দায়িত্ব পাবেন, তার ডেস্কে চিঠিটি থাকবে।’
বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স আরো বলেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসার জন্য বারবার চাপ দিয়েছি। একই সঙ্গে আমি বলতে পারি, আমি অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা ও কর্মীদের সঙ্গে অন্তত ১০ বার বসেছি। আমি ও আমার কর্মীরা বলেছি, আমরা চিন্তিত। আমার মুখ দেখে বুঝুন, আমি চিন্তিত যে আপনারা টিকার সংকটে পড়তে যাচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা স্পষ্ট ছিল যে দেশে টিকা আনতে না পারলে সমস্যা তৈরি হবে।’
এ ছাড়া গত দুই বছরে বাংলাদেশে কোনো টিকা সংকট ছিল কিনা জানতে চাইলে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘আমরা ২০২৪ সালেই টিকার সংকটের পূর্বাভাস দিয়েছিলাম। পরবর্তী দুই বছরে বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আমরা আগেভাগেই সতর্ক করছিলাম এবং ক্রমাগত মনে করিয়ে দিচ্ছিলাম যে, তারা সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে।’
ইউনিসেফ প্রতিনিধি আরও জানান, তারা এখন সরকার এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে মিলে উচ্চ-ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের কাছে পৌঁছানো এবং প্রাদুর্ভাব কবলিত এলাকায় নজরদারি জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ইউনিসেফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ ১৭.৮ মিলিয়ন ডোজ হামের টিকা পেয়েছে, যা দেশটির মোট চাহিদার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৭০ মিলিয়ন ডোজ টিকার প্রয়োজন হয়, কিন্তু পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাবে রুটিন টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, দেশে হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর গত ১৫ই মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮১ জনে। এর মধ্যে ৭৭ জনের হামে মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া এই সময়ের মধ্যে মোট ৫৭ হাজার ৮৫৬ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে মোট আট হাজার ৬৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।