নিপাহ ভাইরাস এখন আর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মৌসুমি রোগ নয়। উচ্চ মৃত্যুহার, বিস্তৃত ভৌগোলিক বিস্তার এবং সংক্রমণের ধরন বদলে যাওয়ার ফলে এটি ধীরে ধীরে দেশজুড়ে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে রোগটি দেশের অর্ধেকের বেশি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। একসময় কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও, গত ২৫ বছরে অন্তত ৩৫টি জেলায় সংক্রমণের রেকর্ড পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভোলাতেও ভাইরাসটির উপস্থিতি ধরা পড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো মৃত্যুহার। ২০০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪৭ জন। তাদের মধ্যে ২৪৯ জন মারা গেছেন। ২০২২-২৩ সালে দেশে এ রোগে আক্রান্ত ১৪ জনের মধ্যে ১০ জনই মৃত্যুবরণ করেন। গত দুই বছরে (২০২৪–২০২৫) শনাক্ত হওয়া সব রোগীই মারা গেছেন। অর্থাৎ এই সময়ে মৃত্যুহার দাঁড়িয়েছে শতভাগে। এসব তথ্য জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর)। একই সময়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের সবাই মারা গেছেন।
বিশ্বজুড়ে নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুহার গড়ে ৭২ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক চিত্র ভয়াবহ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নিপাহ ভাইরাস একটি ভাইরাসজনিত জুনোটিক রোগ, অর্থাৎ এটি প্রাণীর দেহ থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। আক্রান্তের মৃত্যুর হার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বলে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও)।
আইইডিসিআর জানায়, গত ২৫ বছরে দেশের অন্তত ৩৫টি জেলায় নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এর মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাট জেলায় রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ফরিদপুর জেলায়, দ্বিতীয় অবস্থানে রাজবাড়ী।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণের সক্ষমতার দিক থেকে নিপাহ কোভিডের তুলনায় অনেক বেশি ভয়ংকর। মানুষের মধ্যে এর সংক্রমণের হার প্রায় ২৮ শতাংশ, যেখানে কোভিডের সময় হার ছিল ৮–১০ শতাংশ। কোভিড দ্রুত ছড়ালেও মৃত্যুহার কম ছিল। কিন্তু নিপাহর সংক্রমণ হার কম মনে হলেও মানুষের শরীরে কোনো প্রাকৃতিক প্রতিরোধ বা ইমিউন ‘মেমরি সেল’ না থাকার কারণে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
নিপাহ ভাইরাসের অন্যতম বাহক হচ্ছে বাদুড়। মেরু অঞ্চল ও মরুভূমি বাদে বিশ্বের প্রায় সব এলাকায় বাদুড়ের বিস্তৃতি রয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ১৪০০ প্রজাতির বাদুড় শনাক্ত করা হয়েছে, যা এই ভাইরাসের বিস্তারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। তাই নিপা ভাইরাস প্রতিরোধে খেজুরের কাঁচা রস এবং বাদুড়ের মুখ দেওয়া ফল খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিনের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান ডা. আরিফা আকরাম বর্না জানান, সাধারণত খেজুরের কাঁচা রসকে নিপা ভাইরাসের প্রধান উৎস মনে করা হলেও কেবল এতেই সীমাবদ্ধ নয় এই ঝুঁকি। বাদুড়ের লালা বা প্রস্রাবে দূষিত যেকোনো আধা-খাওয়ার ফলের মাধ্যমেও এই প্রাণঘাতী ভাইরাস ছড়াতে পারে। এমনকি সাম্প্রতিক গবেষণায় আক্রান্ত মায়ের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরেও নিপা ভাইরাস সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
রোগের লক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে তিনি বলেন, নিপা ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশের ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে সাধারণত রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াও ভাইরাসটি ৪৫ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীর তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, বমি ভাব, গলা ব্যথা কিংবা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এছাড়া মস্তিষ্কের তীব্র সংক্রমণ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত মারাত্মক সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে অধিকাংশ রোগী মৃত্যুমুখে পতিত হন। এমনকি যারা সুস্থ হয়ে ওঠেন, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে মস্তিষ্কের সংক্রমণে ভুগতে পারেন।
ডা. আরিফা আরও বলেন, নিপা ভাইরাস শনাক্ত করতে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রস্রাব, রক্ত, সেরেব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড পরীক্ষা করা হয়। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জীবাণু হওয়ায় সাধারণত বায়োসেফটি লেভেল-৪ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। তবে সংগ্রহের সময় নমুনাগুলো যদি নিষ্ক্রিয় করা হয়, সেক্ষেত্রে এটি বায়োসেফটি লেভেল-২ পরীক্ষাগারে সাবধানতার সঙ্গে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
আইইডিসিআর বলছে, নিপাহ জুনোটিক রোগ হওয়ায় এর প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তারা ‘ওয়ান হেলথ’ মডেলে কাজ করছে, যেখানে মানুষের স্বাস্থ্য ছাড়াও প্রাণী, পরিবেশ এবং সমাজের আচরণ সমান গুরুত্ব দেওয়া পায়। সংক্রমণের খবর পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করা হয়। এই টিমে থাকেন ক্লিনিক্যাল বিশেষজ্ঞ, এপিডেমিওলজিস্ট, ভেটেরিনারিয়ান এবং সামাজিক বিজ্ঞানী। তারা সরাসরি মাঠে গিয়ে উৎস চিহ্নিত করা, সংক্রমণের চেইন ট্র্যাক করা এবং তা ভেঙে দেওয়ার কাজ করেন।