প্রকৃতি যখন রুদ্রমূর্তি ধারণ করে, তখন তার প্রথম আঘাতটা আসে মানুষের শরীরের ওপর। আমরা অনেকেই ভাবি, গরম মানেই একটু ঘাম বা অস্বস্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষের শরীর মূলত একটি থার্মোস্ট্যাটের মতো কাজ করে যা অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। কিন্তু পারদ যখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায় এবং বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যায়, তখন ঘাম আর শুকাতে চায় না। শরীর তখন আর নিজেকে ঠাণ্ডা করতে পারে না। এই পর্যায়টিকে চিকিৎসকরা বলেন থার্মাল ব্রেকডাউন। এই অবস্থায় শরীরের প্রতিটি অঙ্গ বিকল হতে শুরু করে, যাকে আমরা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলি ‘হিটস্ট্রোক’।
বিশ্বখ্যাত চিকিৎসকদের মতে, এই লড়াইয়ে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি অসহায়। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক এবং প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের শরীরের আয়তন বড়দের তুলনায় ছোট হলেও তাদের শরীরের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাপ শোষণের হার অনেক বেশি। এছাড়া শিশুদের ঘাম গ্রন্থিগুলো পূর্ণবয়স্কদের মতো পুরোপুরি কার্যকর নয়, ফলে তারা দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, বয়স্কদের ক্ষেত্রে বার্ধক্যজনিত কারণে তাদের তৃষ্ণা পাওয়ার অনুভূতি কমে যায় এবং হার্ট বা কিডনির কার্যক্ষমতা আগের মতো থাকে না। ফলে তারা বুঝতে পারার আগেই শরীর মারাত্মক পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তীব্র গরমে প্রাণের ঝুঁকি এড়াতে কিছু বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
পানির চেয়েও বেশি কিছু: মেয়ো ক্লিনিকের চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন, শুধু পানি পান করাই যথেষ্ট নয়। শরীর থেকে ঘামের সঙ্গে সোডিয়াম ও পটাশিয়াম বেরিয়ে যায়। তাই শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য পানির পাশাপাশি ডাবের পানি বা ওরাল স্যালাইন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে ‘সাইলেন্ট ডিহাইড্রেশন’ হতে পারে, যেখানে তারা তৃষ্ণা অনুভব না করলেও ভেতরে ভেতরে পানিশূন্য হয়ে পড়েন।
পোশাক ও পরিবেশের সমন্বয়: জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের জন্য এই সময়ে হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতির পোশাক বেছে নেওয়া জরুরি। সরাসরি রোদে শিশুদের না নেওয়া এবং ঘরের ভেতর বাতাসের চলাচল নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। যদি ঘরে এসি না থাকে, তবে জানালার সামনে ভেজা পর্দা টাঙিয়ে বা বারবার শরীর মুছিয়ে দিয়ে তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা করতে হবে।
লক্ষণ চেনা: যদি দেখেন শিশু অস্বাভাবিক কান্নাকাটি করছে, প্রস্রাব কমে গেছে বা চোখ বসে গেছে, তবে বুঝতে হবে সে পানিশূন্যতায় ভুগছে। অন্যদিকে, বয়স্কদের ক্ষেত্রে যদি বিভ্রান্তি, অসংলগ্ন কথাবার্তা বা হঠাৎ খুব দুর্বলতা দেখা দেয়, তবে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ হিটস্ট্রোকের আগে মস্তিষ্ক তার সংকেত পাঠানো বন্ধ করে দেয়।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: বিখ্যাত পুষ্টিবিদদের মতে, এই সময়ে চিনিযুক্ত পানীয় বা ক্যাফেইন (চা-কফি) এড়িয়ে চলা উচিত। এগুলো শরীর থেকে পানি আরও বের করে দেয়। এর বদলে তরমুজ, শসা বা টক দইয়ের মতো জলীয় খাবার বেশি করে খাওয়াতে হবে।
শেষ কথা মানুষের শরীর কোনো লোহা বা পাথর নয় যে সে অসীম তাপ সইতে পারবে। যখন প্রকৃতি তার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন আমাদের সচেতনতাই হতে পারে একমাত্র বর্ম। শিশুদের প্রাণচাঞ্চল্য আর বৃদ্ধদের শান্তিতে থাকা নিশ্চিত করতে এই গরমে তাদের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া কেবল পারিবারিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি জীবন রক্ষার লড়াই। মনে রাখবেন, হিটস্ট্রোক প্রতিরোধের সেরা উপায় হলো ঘরকে শীতল রাখা এবং শরীরকে পানিশূন্য হতে না দেওয়া।