সুস্থ থাকতে এখন অনেকেই নিয়মিত হাঁটছেন, দৌড়াচ্ছেন কিংবা জিমে যাচ্ছেন। কেউ আবার যোগব্যায়াম বা সাইকেল চালানোকে বেছে নিচ্ছেন দৈনন্দিন অভ্যাস হিসেবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে, ব্যায়ামের সবচেয়ে ভালো সময় কোনটি? ভোরবেলা, নাকি সন্ধ্যা?
নতুন এক গবেষণা বলছে, এর উত্তর সবার জন্য এক নয়। মানুষের শরীরের ভেতরে যে স্বাভাবিক সময়চক্র কাজ করে, সেই দেহঘড়ির সঙ্গে মিল রেখেই ব্যায়াম করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ যারা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে অভ্যস্ত, তাদের জন্য সকালের ব্যায়াম বেশি উপকারী হতে পারে। আর যারা রাত জেগে কাজ করেন বা দেরিতে ঘুমান, তাদের জন্য সন্ধ্যা বা রাতের দিকে শরীরচর্চা করাই ভালো।
সম্প্রতি হৃদরোগবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে দেখা গেছে, নিজের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে মিল রেখে ব্যায়াম করলে শুধু শরীর নয়, ঘুম, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রাও ভালো থাকে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই হৃদরোগের ঝুঁকি আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই উপকার আরও বেশি দেখা গেছে।
গবেষণাটিতে অংশ নেন মধ্যবয়সী প্রায় ১৩৫ জন মানুষ। তাদের অনেকেরই উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত ওজন কিংবা শারীরিক দুর্বলতার মতো সমস্যা ছিল। তিন মাস ধরে সপ্তাহে পাঁচ দিন প্রতিদিন প্রায় ৪০ মিনিট করে দ্রুত হাঁটার অনুশীলন করানো হয়। এরপর গবেষকরা দেখেন, যারা নিজেদের স্বাভাবিক ঘুম ও জাগরণের সময় অনুযায়ী ব্যায়াম করেছেন, তারা তুলনামূলক বেশি উপকার পেয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের শরীরে একটি প্রাকৃতিক সময়চক্র কাজ করে, যেটি ঘুম, হরমোন, ক্ষুধা এমনকি শক্তির মাত্রাও নিয়ন্ত্রণ করে। কেউ সকালে বেশি চাঙা অনুভব করেন, আবার কেউ রাতের দিকে বেশি সক্রিয় থাকেন। এই ভিন্নতার কারণেই সবার জন্য একই ব্যায়ামের সময় উপযোগী হয় না।
ঢাকার চিকিৎসকরাও একই ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সকালে ব্যায়াম করলে দিনের শুরুটা প্রাণবন্ত হয় এবং মানসিক চাপ কমে। তবে যাদের সকালে উঠতে কষ্ট হয় বা শরীর দুর্বল লাগে, তাদের জোর করে ভোরে ব্যায়াম করার দরকার নেই। বরং সন্ধ্যায় নিয়মিত শরীরচর্চা করলে সেটিও সমান কার্যকর হতে পারে।
সাম্প্রতিক আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিকেলের দিকে শরীরের তাপমাত্রা ও পেশির কার্যক্ষমতা কিছুটা বেশি থাকে। ফলে ওই সময়ে শক্তিনির্ভর ব্যায়াম করলে অনেকের ভালো ফল মিলতে পারে। আবার সকালে হাঁটা বা হালকা দৌড় মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারী বলেও মত দিয়েছেন গবেষকরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ব্যায়ামের সময় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত শরীরচর্চা করা। অনেকে শুরুতে খুব উৎসাহ নিয়ে ব্যায়াম শুরু করলেও কয়েক সপ্তাহ পর আর চালিয়ে যেতে পারেন না। কিন্তু শরীর সুস্থ রাখতে দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসই সবচেয়ে বড় বিষয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সপ্তাহে অন্তত আড়াই ঘণ্টা মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা করা উচিত। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সাঁতার কাটাও এর মধ্যে পড়ে। পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন শরীরের শক্তি বাড়ানোর অনুশীলন রাখা ভালো।
অনেকেই শুধু জিমকেই ব্যায়াম মনে করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার, নাচ, খেলাধুলা কিংবা ঘরের কাজও শরীরকে সচল রাখে। সবচেয়ে ভালো ফল মেলে যখন হাঁটা, শক্তিবর্ধক অনুশীলন আর নমনীয়তা বাড়ানোর ব্যায়াম—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখা যায়।
ঢাকার ব্যস্ত জীবনে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, দিনে কয়েক ঘণ্টা একটানা বসে থাকা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই ব্যায়াম করার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাসও কমাতে হবে।
সবশেষে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ একটাই, নিজের শরীরের কথা শুনুন। অন্য কেউ ভোরে উঠে দৌড়াচ্ছে বলে আপনাকেও সেটি করতে হবে—এমন নয়। যে সময়ে শরীর সবচেয়ে স্বস্তি পায় এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা সম্ভব হয়, সেই সময়টাই আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো।
সূত্র: বিবিসি বাংলা, ওপেন হার্ট সাময়িকী, যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিটিশ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ সমিতি