কোরবানির ঈদ মানেই ঘরে ঘরে মাংসের প্রাচুর্য। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী আর গরিব মানুষের মধ্যে বণ্টনের পরও অনেক পরিবারে থেকে যায় বেশ কিছু মাংস। এখন ফ্রিজের যুগে সেই মাংস সংরক্ষণ করা সহজ হলেও একসময় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এত সুযোগ ছিল না। তখন মানুষ প্রকৃতির কাছ থেকেই শিখেছিল সংরক্ষণের কৌশল। সেই কৌশলেরই এক সুস্বাদু রূপ গরুর মাংসের শুঁটকি।
একসময় দেশের দক্ষিণাঞ্চল, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, কুড়িগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী কিংবা চট্টগ্রামের বহু পরিবারে কোরবানির পর মাংস পাতলা করে কেটে লবণ ও হলুদ মাখিয়ে রোদে শুকিয়ে রাখা হতো। কয়েকদিনের মধ্যেই সেই মাংস শক্ত, গাঢ় রঙের ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য হয়ে উঠত। মাসের পর মাস কোনো হিমঘর ছাড়াই এটি খাওয়া যেত। বয়স্কদের অনেকেই এখনো বলেন, ঈদের পর গ্রামের উঠানে বাঁশের চাটাইয়ের ওপর শুকাতে দেওয়া মাংসের দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত।
খাদ্য গবেষকদের মতে, এটি শুধু স্বাদের বিষয় নয়, বরং প্রয়োজনেরও ইতিহাস। ফ্রিজবিহীন সময়ে অতিরিক্ত মাংস নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতেই এই পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়েছিল। মাংসের ভেতরের আর্দ্রতা শুকিয়ে গেলে জীবাণু সহজে বংশবিস্তার করতে পারে না। ফলে দীর্ঘদিন ভালো থাকে শুঁটকি মাংস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই শুকনো মাংস সংরক্ষণের নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। বাংলাদেশের গরুর মাংসের শুঁটকি সেই ঐতিহ্যেরই স্থানীয় সংস্করণ।
তবে এখন আর এটি শুধু সংরক্ষণের কৌশল নয়, অনেকের কাছে রীতিমতো রসনাবিলাস। শহরের অনেক মানুষ কোরবানির ঈদের পর বিশেষভাবে গরুর মাংসের শুঁটকি তৈরি করেন। কারণ সাধারণ গরুর মাংসের চেয়ে এর স্বাদ অনেক বেশি ঘন, ঝাঁঝালো ও আলাদা। শুঁটকিপ্রেমীরা বলেন, এক প্লেট গরম ভাত আর ঝাল ঝাল গরুর শুঁটকি ভুনা হলে অন্য কোনো তরকারির প্রয়োজন পড়ে না। এর স্বাদ যেন মুখে লেগে থাকে বহুদিন।
মজার বিষয় হলো, মাছের শুঁটকির মতো গরুর মাংসের শুঁটকিও ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে জনপ্রিয় হচ্ছে। ঈদের পর অনেকেই নিজেদের তৈরি শুঁটকির ছবি ও রান্নার ভিডিও প্রকাশ করেন। দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যেও এর চাহিদা বাড়ছে। কারণ এই খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শৈশব, গ্রামের বাড়ি, নানী- দাদির রান্নাঘর আর ঈদের স্মৃতি।
গরুর মাংসের শুঁটকি তৈরির প্রক্রিয়া খুব জটিল নয়। সাধারণত চর্বিহীন মাংস ছোট ও পাতলা টুকরো করে কেটে লবণ ও হলুদ মাখিয়ে নেওয়া হয়। কেউ কেউ হালকা সেদ্ধও করে নেন। এরপর পরিষ্কার কাপড় বা জালের আড়ালে কয়েকদিন রোদে শুকানো হয়। মাংস পুরোপুরি শক্ত হয়ে গেলে সেটি সংরক্ষণ করা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুকানোর সময় পরিচ্ছন্নতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যাতে ধুলাবালি, মাছি বা আর্দ্রতা মাংসে না লাগে।
শুঁটকি রান্নার যত কৌশল
শুঁটকি রান্নার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা অঞ্চলভেদে ভিন্নতা। কোথাও এটি ঝুরা করে ভুনা করা হয়, কোথাও মরিচ ও পেঁয়াজ দিয়ে কষিয়ে রান্না করা হয়। অনেক পরিবারে শুঁটকি আগে গরম পানিতে ভিজিয়ে নরম করা হয়। এরপর পেঁয়াজ, রসুন, আদা, শুকনো মরিচ, ধনে ও জিরার মসলা দিয়ে ধীরে ধীরে কষানো হয়। রান্না শেষে মাংস ঝুরঝুরে হয়ে এলে তার ঘ্রাণেই ক্ষুধা বেড়ে যায়।
অনেকে আবার শুঁটকি ভর্তাও করেন। সেদ্ধ করে নেওয়া শুঁটকি শিলপাটায় বা পেষণিতে বেটে তার সঙ্গে কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ ও সরিষার তেল মিশিয়ে তৈরি হয় অসাধারণ স্বাদের ভর্তা। দেশের কিছু অঞ্চলে আলু, কচু কিংবা শাকের সঙ্গেও এটি রান্না করা হয়।
পুষ্টিবিদদের মতে, শুকনো মাংসে প্রোটিনের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি থাকে। তবে লবণের পরিমাণ বেশি হওয়ায় এটি পরিমিত খাওয়াই ভালো। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ঈদের পর যখন ফ্রিজ ভর্তি মাংস নিয়ে অনেক পরিবার দুশ্চিন্তায় থাকে, তখন গরুর মাংসের শুঁটকি যেন পুরোনো বাংলার এক বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান হয়ে সামনে আসে। এটি শুধু খাবার নয়, বরং এক টুকরো ইতিহাস। রোদের নিচে শুকিয়ে যাওয়া সেই মাংসের সঙ্গে মিশে থাকে গ্রামের উঠান, পারিবারিক স্মৃতি আর হারিয়ে যেতে বসা বাঙালির এক খাদ্যঐতিহ্যের কথকতা।