শেরপুর-৩ সংসদীয় আসনের সাধারণ নির্বাচন ও শূন্য ঘোষিত বগুড়া-৬ সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে আগামী ৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর পরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত ঘোষণার চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করতে চায় তারা। এরই মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শাখা তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফাইল প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে। কমিশন সভায় আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হবে, ঈদুল ফিতরের আগে নাকি পরে তফসিল ঘোষণা করা হবে। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তিন সিটির নির্বাচনই ঈদুল আজহার আগেই সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী প্রশাসন ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৭টি উপজেলা পরিষদ ও ৬৪টি জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। এরপর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুটি সিটিসহ দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এর প্রতিবাদ জানায়। সমালোচকদের অভিযোগ, স্থানীয় নির্বাচন পিছিয়ে দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আবার বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু মেয়র পদে প্রশাসক বসালে নাগরিক সেবা কতটা নিশ্চিত হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাই দ্রুত স্থানীয় নির্বাচন শুরু করা উচিত।
ইসি সূত্রে জানা যাচ্ছে, রমজান মাসজুড়ে সিটি করপোরেশন আইন ও আচরণবিধি পর্যালোচনা করা হবে। কোথায় সংশোধন বা সংযোজন দরকার, তা চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের কাছ থেকে সহিংসতা না করার অঙ্গীকারনামা নেওয়া হয়েছিল, যা ইতিবাচক ফল দিয়েছে বলে মনে করছে কমিশন। একই অভিজ্ঞতা সিটি নির্বাচনেও প্রয়োগের চিন্তা রয়েছে।
এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের জন্য আলাদা আচরণবিধির পরিবর্তে একটি অভিন্ন আচরণবিধি করার পরিকল্পনাও রয়েছে। গত বছর ২৫ আগস্ট জারি হওয়া সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। ফলে নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন আয়োজনের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। তবে সংসদের অনুমোদনের আগে ইসি কোনো নির্বাচন আয়োজন করবে না। এ কারণে প্রস্তুতি এগোলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ইসি জানিয়েছে, সরকারের সংকেত পেলে বর্ষা মৌসুম ও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা বিবেচনায় রেখে তফসিল ঘোষণা করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনের জটিলতা দূর করা জরুরি। সহিংসতা রোধে অঙ্গীকারনামা চালু এবং সব স্তরের স্থানীয় সরকারের জন্য অভিন্ন আচরণবিধি প্রণয়নই কমিশনের প্রধান লক্ষ্য।’
অন্যদিকে কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছাড়াও অনেক স্থানীয় নির্বাচন আছে তা আয়োজন করতে হয়। সারা বছর ধরে নির্বাচন হবে। ঈদের পর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হবে। দলীয় প্রতীক নাকি নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে তার জন্য সংসদের প্রথম অধিবেশনের জন্য অপেক্ষা করছি। আইন অনুযায়ী ভালো নির্বাচনের জন্য কমিশন প্রস্তুত থাকবে।’
এদিকে সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও, যদি তিনটি সিটি নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজন করা না যায়, তাহলে অন্তত ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন আগে হলেও হতে পারে বলে ইসি সুত্র নিশ্চিত করেছে। আর এর তফসিল ঘোষণা শেরপুর-৩ ও বগুড়া-৬ আসনের ফল ঘোষনার পর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে, তুলনামূলকভাবে সহিংসতামুক্ত একটি নির্বাচন উপহার দেওয়ায় বর্তমান ইসির প্রতি জনগণের প্রত্যাশাও এখন অনেক বেশি। তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান কমিশনের জন্য এই তিন সিটি নির্বাচন বড় পরীক্ষা হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা হবে প্রধানতম চ্যালেঞ্জ।’
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আবদুল আলীম বলেন, ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালনা জরুরি। তাই দ্রুত নির্বাচন না হলে প্রশাসনিক সংকট আরও বাড়তে পারে।’