বাংলাদেশে নতুন সংসদ গঠনের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা তুঙ্গে উঠেছে। তবে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব জানাচ্ছে, আপাতত রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই এবং সংবিধান অনুযায়ী তিনি পদে বহাল থাকবেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া মো. সাহাবুদ্দিনের পদকাল ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। সংবিধান অনুযায়ী, তিনি নিজে পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বা সংসদে অভিশংসন বা অপসারণ না করা পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ নেই।
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পেয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং সংবাদমাধ্যমেও বিভিন্ন নাম উত্থাপিত হয়েছে। দলের অনেক নেতাকর্মী ধারণা করছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠণ করায় তারা চাইলে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তবে বিএনপির শীর্ষ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অন্য নেতারা এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা করেননি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই বিষয়টি আলোচনার তালিকায় নেই।
রাষ্ট্রপতি বহাল রাখার কারণ
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময়ও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের দাবি উঠেছিল। যদিও আন্দোলনের অংশীদার ও অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সদস্য সেই দাবি তুলেছিল, বিএনপি প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে সংবিধান রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল। নেতাদের যুক্তি ছিল, রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দিলে দেশে সাংবিধানিক জটিলতা বা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। সেই অবস্থান থেকে সরকার নতুন সংসদ গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতিকে বহাল রেখেই এগোতে চাইছে।
এদিকে আগামী ১২ মার্চ নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হবে। নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদে ভাষণ দেবেন। যদিও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক দলগুলো এই ভাষণের বিরোধিতা করছে, সরকার তাদের অবস্থানকে আপাতত আমলে নিচ্ছে না।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রস্তুত
বিএনপি সরকার সংসদের জন্য রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রস্তুত করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভায় ভাষণসংক্রান্ত আলোচনা ইতোমধ্যে হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণে সরকারের কর্মকাণ্ড ও নীতিমালা তুলে ধরা হয়। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে রাখার মাধ্যমে সরকার নতুন সংসদ কার্যক্রম শুরু করতে চায় এবং বিরোধীদের একটি রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের পথ
রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ার জন্য তিনটি উপায় রয়েছে—স্বেচ্ছায় পদত্যাগ, সংসদের মাধ্যমে অভিশংসন, অথবা শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্য। অভিশংসনের ক্ষেত্রে গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বিবিসি বাংলাকে বলেন, অভিশংসনের দায়ভার সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ওপর বর্তায়।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলছেন, আপাতত এই দুই পথই তারা অনুসরণ করতে চাইছে না। তবে রাষ্ট্রপতি নিজে পদত্যাগ করলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নির্বাচনের আগে গত ডিসেম্বরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, তিনি নির্বাচনের পর পদত্যাগ করতে পারেন। এ ছাড়া সম্প্রতি কালের কণ্ঠ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘যদি তারা মনে করে আমি থাকি, তাহলে আমি থাকব। আর যদি বলে যে, সরে যাওয়া ভালো; তাহলে আমি নিজেই সম্মানজনকভাবে সরে যাব।’
বিএনপির ভেতরেও মতভেদ
দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে একাংশ মনে করছেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা অবস্থায় ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সময়কার রাষ্ট্রপতিকে বহাল রাখা যৌক্তিক নয়। আবার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কিছু নেতা মনে করেন, এখন রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করলে ভবিষ্যতে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরত আনার সম্ভাবনা থাকায়, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ সরকারের কার্যকাল শেষের পরও নির্দিষ্ট সময় ধরে বজায় রাখা নিরাপদ বলে তারা মনে করছেন।
সামগ্রিক পরিস্থিতি
বর্তমানে সরকার রাষ্ট্রপতিকে বহাল রেখে সংসদ কার্যক্রম শুরু করতে চায়। এর মাধ্যমে সংবিধান রক্ষা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তবে সংসদ যাত্রা শুরু হওয়ার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা উন্মুক্ত থাকবে।
মো. সাহাবুদ্দিন ইতিমধ্যেই তিনটি ভিন্ন সরকারের শপথ পড়িয়ে নজির সৃষ্টি করেছেন—আওয়ামী লীগের শেষ সময়, অন্তর্বর্তী সরকার ও সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর বিএনপি সরকারকে। নতুন সংসদ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে, তিনি পদে বহাল থাকবেন নাকি পরিবর্তন আসবে।