ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো তথ্যপ্রযুক্তি–সমর্থিত পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি চালু করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রবাসে অবস্থানরত ভোটার, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়।
এই নতুন ব্যবস্থায় দেওয়া ভোটের বড় অংশই পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিশ্লেষণে দেখা যায়, পোস্টাল ব্যালটে মোট প্রদত্ত ভোটের সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রথম দুটি দল হলো জামায়াত, যারা পেয়েছে ৪৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ, আর বিএনপি পেয়েছে ৩০ দশমিক ২৮ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ ৭৬ দশমিক ১৬ শতাংশ গেছে এই দুই দলের ঝুলিতে।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল বিবরণী বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশের ৩০০ আসনে পোস্টাল ব্যালটের মোট ভোটার ছিলেন ১৫ লাখ ২০ হাজার ৯৩ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৪ জন।
সে হিসাবে পোস্টাল ব্যালটে ভোট পড়েছে ৬৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। মোট বাতিল ভোট ছিল ৫৭ হাজার ৮৯৮টি।
দলভিত্তিক পোস্টাল ভোটের হিসাবের বিশ্লেষণে দেখা যায়—জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১১৪ ভোট (৪৫.৮৮ শতাংশ) এবং এর জোট সঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ৫২ হাজার ৮৪০ ভোট (৪.৯৬ শতাংশ)। অর্থাৎ এই দুই দলই ৫০ শতাংশের উপরে ভোট পেয়েছে।
যদিও চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলে সবচেয়ে বেশি ২০৯টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি, তবে পোস্টাল ব্যালটের ভোটে এগিয়ে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে জেতা বিএনপি পেয়েছে ৩ লাখ ২২ হাজার ১৪৪ ভোট (৩০.২৮ শতাংশ)।
এই তিনটি দল মিলিয়ে পেয়েছে ৮ লাখ ৬৩ হাজার ১২৮ ভোট, যা মোট প্রদত্ত ভোটের ৮১ দশমিক ১৩ শতাংশ। বাকি ভোট পেয়েছে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
দুই আসনের ফল বদলে দিয়েছে পোস্টাল ভোট।
নির্বাচনের আগে থেকেই ধারণা ছিল, পোস্টাল ভোট কিছু আসনের ফল পাল্টে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত সারাদেশে দুটি আসনের ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে এই ভোট। এই দুটি আসন হলো সিরাজগঞ্জ–৪ ও মাদারীপুর–১।
সিরাজগঞ্জ–৪ আসনে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে বিএনপি প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও পোস্টাল ব্যালটের ভোট যুক্ত হওয়ার পর জয়ী হন জামায়াত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম খান।
কেন্দ্রের ফলাফলে তিনি পেয়েছিলেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৩ ভোট। আর বিএনপি প্রার্থী এম আকবর আলী পেয়েছিলেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৫৮ ভোট।
পোস্টাল ব্যালটে জামায়াত প্রার্থী পান ২ হাজার ১৭৯ ভোট, আর বিএনপি প্রার্থী পান ৮২০ ভোট। ফলে চূড়ান্ত ফলাফলে ৫৯৪ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন জামায়াত প্রার্থী।
মাদারীপুর–১ আসনেও একই ধরনের পরিবর্তন ঘটে। কেন্দ্রভিত্তিক ভোটে বিএনপি প্রার্থী নাদিরা আক্তার এগিয়ে থাকলেও পোস্টাল ভোটে এগিয়ে যান বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা।
কেন্দ্রের ফলাফলে নাদিরা আক্তারের ভোট ছিল ৬৪ হাজার ২৯১ এবং হানজালার ভোট ছিল ৬৩ হাজার ৫১১। কিন্তু পোস্টাল ব্যালটে হানজালা পান ১ হাজার ৩৯৮ ভোট, আর বিএনপি প্রার্থী পান ২৩৩ ভোট। ফলে চূড়ান্ত ফলাফলে ৩৮৫ ভোটে বিজয়ী হন হানজালা।
১৭২ আসনে ভোট ৭০ শতাংশের বেশি
পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সারাদেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৭২টি আসনে ভোট পড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে রংপুর–২ আসনে, যেখানে ভোটের হার ৮৭ দশমিক ০৮ শতাংশ।
অন্যদিকে চারটি আসনে কোনো পোস্টাল ভোট পড়েনি। এসব আসন হলো—পঞ্চগড়–২, ঠাকুরগাঁও–২, ঠাকুরগাঁও–৩ এবং চট্টগ্রাম–১।
দলীয় প্রধানদের পোস্টাল ভোটের লড়াই
পোস্টাল ব্যালটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেছে।
ঢাকা–১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান চূড়ান্ত ফলাফলে জয়ী হলেও পোস্টাল ব্যালটে পিছিয়ে ছিলেন। তিনি পোস্টাল ব্যালটে পান ১ হাজার ২৫৬ ভোট, আর জামায়াত প্রার্থী স. ম. খালিদুজ্জমান পান ২ হাজার ৩২৮ ভোট।
অন্যদিকে বগুড়া–৬ আসনে চূড়ান্ত ফলের পাশাপাশি পোস্টাল ভোটেও জয় পান তারেক রহমান।
ঢাকা–১৫ আসনে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান চূড়ান্ত ফলাফলের পাশাপাশি পোস্টাল ব্যালটেও এগিয়ে থেকে জয়ী হন। আর ঢাকা–১১ আসনে নাহিদ ইসলাম পোস্টাল ভোটেও বিজয় পান।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে শক্ত অবস্থান
পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় জামায়াত ও তাদের মিত্রদের শক্ত অবস্থান রয়েছে।
বিশেষ করে কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলার বেশ কয়েকটি আসনে চূড়ান্ত ফলাফলে পরাজিত হলেও পোস্টাল ভোটে বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিল জামায়াত।
এনআইডির সঙ্গে পাসপোর্ট নিবন্ধনের বিবেচনায় এলে ভোটার নিবন্ধন এবং বিএনপি ভোট বাড়তো।
জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আমরা প্রথম থেকেই প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিয়ে কথা বলেছি, দাবি জানিয়েছি। সরকার এটা মেনে নিয়ে এবার ব্যবস্থা করেছেন। প্রবাসীরাও আমাদের প্রচেষ্টার স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘প্রবাসীদের একটি বড় অংশ এনআইডি নিয়ে দেশের বাইরে কাজে যাননি। তাই তারা ভোটে অংশই নিতে পারেননি। তাছাড়া বিএনপি এনআইডির পাশাপাশি পাসপোর্টকেও নিবন্ধনের ভিত্তি হিসেবে নিতে আবেদন করেছিল। এটা করা গেলে ভোটার সংখ্যা বাড়ত এবং সঙ্গে বিএনপির ভোটও বাড়ত। তাছাড়া যেসব ভোট নষ্ট হয়েছে সেখানে বিএনপির এক বড় অংশ ছিল বলেই আমাদের বিশ্বাস।’